শিরোনাম
দ্বিতীয় দিনে ৩ জাহাজে সেন্টমার্টিন যাচ্ছেন ১৫৫৪ পর্যটকঅধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে আজিমপুর সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভসংসদ ভবন এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধজামিনে বাড়ি ফেরার পথে ফের গ্রেপ্তার সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মামাতো ভাইফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ৪৪৮ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৫৪৪টানা তৃতীয় দফায় স্বর্ণের দাম বাড়ল ১২০৭২ টাকা৫৪৮ জনের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করলেন ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নরদ্বিতীয় দিনে ৩ জাহাজে সেন্টমার্টিন যাচ্ছেন ১৫৫৪ পর্যটকঅধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে আজিমপুর সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভসংসদ ভবন এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধজামিনে বাড়ি ফেরার পথে ফের গ্রেপ্তার সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মামাতো ভাইফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার ৪৪৮ডিএমপির অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৫৪৪টানা তৃতীয় দফায় স্বর্ণের দাম বাড়ল ১২০৭২ টাকা৫৪৮ জনের মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করলেন ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর

জৌলুস হারিয়ে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে লোহাগাড়ার ঐতিহাসিক গুপ্ত জমিদার বাড়ি

লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশ : ৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩৭ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

একসময় প্রায় ১০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত ছিল ১২০ কক্ষের বিশাল জমিদার বাড়ি। ছিল কাছারিঘর, নাচঘর, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পুকুর ও দীঘি। জমিদারি প্রতিপত্তি ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশৈলীর স্মারক সেই বাড়িতে এখন কক্ষ অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ২০টি। দরজা-জানালা হারিয়ে দেয়ালজুড়ে জন্মেছে আগাছা। ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে বাড়ির আঙিনা। জরাজীর্ণ ভবনের বিভিন্ন অংশ যেকোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

এমন ঝুঁকির মধ্যেও বসবাস করছেন জমিদার পরিবারের কয়েকজন উত্তরসূরি। যথাযথ সংস্কার ও সংরক্ষণের অভাবে ক্রমেই অস্তিত্ব হারাতে বসেছে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া ইউনিয়নের ঐতিহাসিক গুপ্ত জমিদার বাড়ি।

স্থানীয়ভাবে ‘অদ্দার বাড়ি’ নামে পরিচিত স্থাপনাটি প্রায় তিন শতাব্দীর পুরোনো বলে প্রচলিত রয়েছে। জমিদার রামমোহন গুপ্তের হাত ধরে বাড়িটির গোড়াপত্তন হয়। কাঠ, চুন, সুরকি ও ইট দিয়ে নির্মিত ভবনটিতে তৎকালীন স্থাপত্যরীতির নান্দনিক নিদর্শন রয়েছে।

বিশালাকার বাড়িটি মূলত দুটি অংশে বিভক্ত। বাইরের অংশে ছিল কাছারিঘর। সেখানে জমিদারেরা প্রজাদের সঙ্গে বৈঠক করতেন, তাঁদের অভিযোগ শুনতেন এবং বিচার-সালিশ করতেন। অন্যদিকে, বাড়ির ভেতরের অংশটি ছিল অন্দরমহল।

বাড়িটির চারপাশে রয়েছে বড় বড় পুকুর, দীঘি ও মন্দির। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে, একসময় এ বাড়ির সামনে দিয়ে কেউ জুতা পায়ে কিংবা মাথায় ছাতা দিয়ে চলাচল করতেন না। এমনকি ব্রিটিশরাও বাড়িটির প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গুপ্ত জমিদার পরিবারের পূর্বপুরুষেরা ময়মনসিংহ জেলা থেকে এসে লোহাগাড়ার পদুয়ায় বসতি স্থাপন করেন। জমিদার রামমোহন গুপ্তের উত্থান ও জমিদারির সূচনা নিয়ে এলাকায় নানা কাহিনি প্রচলিত রয়েছে।

কথিত আছে, রামমোহন গুপ্তের সঙ্গে এক মুসলিম নারীর পরিচয়ের সূত্র ধরে ধর্মভাই-বোনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে ওই নারী স্বপ্নের মাধ্যমে গুপ্তধনের সন্ধান পান। পরে রামমোহন গুপ্তের সহযোগিতায় সেই সম্পদ উদ্ধার করা হয়। নিঃসন্তান ওই নারী তাঁর সম্পদ ধর্মভাই রামমোহনকে দান করেন। সেই সম্পদকে কেন্দ্র করেই তাঁর জমিদারির সূচনা হয়েছিল বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। তবে এ কাহিনির ঐতিহাসিক সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয়দের বর্ণনায়, রামমোহন গুপ্ত প্রজাদের কল্যাণে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করেছিলেন। তাঁর উদ্যোগে মসজিদ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে জানা যায়। ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার একটি কাহিনিও তাঁর পরিবারকে ঘিরে প্রচলিত রয়েছে।

কথিত আছে, তাঁর ধর্মবোনের মৃত্যুর পর প্রতিবছর তাঁকে স্মরণ করে একই রঙের প্রায় আটটি গরু জবাই করে মেহমানদারির আয়োজন করতেন রামমোহন। তাঁর মৃত্যুর পর উত্তরসূরিরা ধীরে ধীরে এ আয়োজন বন্ধ করে দেন।

স্থানীয় বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগপর্যন্ত রামমোহন গুপ্ত ও তাঁর বংশধরেরা জমিদারি পরিচালনা করেন। বিভিন্ন তথ্যমতে, ১৭০০ সালের শেষদিকে ভবনটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। তবে বাড়িটির নির্মাণকাল ও জমিদার পরিবারের ইতিহাস সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে।

১৯৪৮ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর থেকেই বাড়িটির রক্ষণাবেক্ষণে ভাটা পড়ে। এরপর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাড়িটিতে অগ্নিসংযোগ ও মূল্যবান পুরাকীর্তি লুটের ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়ভাবে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার পর স্থাপনাটির অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্থাপত্যের অংশ নষ্ট হয়ে যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল ভবনটির অধিকাংশ কক্ষ এখন ব্যবহার অনুপযোগী। কোথাও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়েছে, কোথাও ছাদ ও ভবনের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দরজা-জানালার অস্তিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে। বড় ফটক ও দেয়ালের ফাঁকে জন্মেছে বটগাছের চারা। বাড়ির আঙিনা ও ভেতরের অংশ ঢেকে গেছে ঝোপঝাড়ে। রয়েছে সাপের উপদ্রবও। ভবনের কোনো অংশ ধসে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

একসময় বিপুল সম্পদের মালিক ছিল যে পরিবার, সময়ের সঙ্গে সেই পরিবারের উত্তরসূরিদের জীবনেও এসেছে পরিবর্তন। বর্তমানে কয়েকজন উত্তরসূরি ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ ভবনটিতে বসবাস করছেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের কেউ চট্টগ্রাম শহরে, আবার কেউ ভারতে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। একসময়ের জমিদারি জৌলুস হারিয়ে পরিবারের অনেকেই এখন অভাব-অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

স্থানীয়দের মতে, গুপ্ত জমিদার বাড়ি কেবল একটি পুরোনো ভবন নয়; এটি দক্ষিণ চট্টগ্রামের ইতিহাস, স্থাপত্য ও সামাজিক বিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। যথাযথ উদ্যোগ না নিলে অযত্ন ও অবহেলায় একসময় স্থাপনাটির অবশিষ্ট অংশও বিলীন হয়ে যেতে পারে। তাই প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব যাচাই করে বাড়িটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

পদুয়া জমিদার বাড়ির নিকটাত্মীয় ও প্রধান শিক্ষক সুনীল চৌধুরী বলেন, ‘গুপ্ত বাড়ি দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়ি। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এ বাড়ির সৌন্দর্য ও প্রতিপত্তি ছিল অপরিসীম। এখনো প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ বাড়িটি দেখতে আসেন। সংস্কারের অভাবে বিশাল স্থাপনাটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। সরকার উদ্যোগ নিয়ে বাড়িটি সংস্কার করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে।’

সাংবাদিক পুষ্পেন চৌধুরী বলেন, ঐতিহাসিক পদুয়া গুপ্ত জমিদার বাড়ি সংরক্ষণের দাবি দীর্ঘদিনের। ভবনটিকে অবিলম্বে পুরাকীর্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

সংসদ ভবন এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ

লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বায়েজীদ বিন আখন্দ বলেন, ঐতিহ্যবাহী পদুয়া জমিদার বাড়িটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে গুপ্ত জমিদার বাড়িটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রায় তিন শতাব্দীর ইতিহাস বুকে ধারণ করা এ স্থাপনার ভবিষ্যৎ এখন কার্যকর সংরক্ষণ উদ্যোগের ওপর নির্ভর করছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সময় থাকতে যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, স্থাপত্যের মূল্যায়ন ও সংস্কারকাজের মাধ্যমে গুপ্ত জমিদার বাড়িটিকে রক্ষা করা হবে। অন্যথায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এ নিদর্শন একদিন কেবল স্মৃতির পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।

ভোরের আকাশ/সু.পা

শেয়ার করুন: