দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলায় ধ্বংসের পথে টাঙ্গাইল ঐতিহ্যবাহী ভাসানী হল

দীর্ঘদিনের চরম অযত্ন, অবহেলা, সংস্কারের অভাব ও প্রশাসনিক উদাসীনতায় অর্ধশতবছরের পুরোনো টাঙ্গাইল ভাসানী হল মিলনায়তনটি এখন পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘদিন যাবত টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ভাসানী হলটি সংস্কার বা পুননির্মাণের কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় স্থানীয় সুধীসমাজ ও সংস্কৃতিকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টাঙ্গাইল শহরের একসময়ের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ঐতিহ্যবাহী ‘ভাসানী হল’ বর্তমানে ধুলোবালি, ভাঙাচোরা দেয়াল আর তালাবদ্ধ কক্ষের নিস্তব্ধতায় ঢাকা। হলের সামনের বারান্দায় বসেছে পানের পাইকারি দোকান। পুরো প্রাঙ্গণ ব্যবহৃত হচ্ছে ট্রাকস্ট্যান্ড হিসেবে। বিভিন্ন স্থান ছিন্নমূল মানুষ অবস্থান করছে।
এক সময় যে প্রাঙ্গণ একসময় নাটক, সংগীত, নৃত্য, কবিতা, বইমেলা এবং রাজনৈতিক-সামাজিক নানা আয়োজনের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর থাকত। সে প্রাঙ্গনেই এখন সন্ধ্যা নামলেই পুরো এলাকায় অন্ধকার ও অপরাধীদের দখলে হয়ে ওঠে মাদকসেবী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আড্ডাখানায় পরিণত হয় । এতে জেলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মনে নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্তমানে দিনে হলটির বারান্দায় বসেছে পানের দোকান আর প্রাঙ্গণটি ব্যবহৃত হচ্ছে ট্রাকস্ট্যান্ড হিসেবে। আর সন্ধ্যার পর পুরো পরিবেশ বদলে যায়। নিয়মিত মাদকসেবীদের আনাগোনা শুরু হয়। এট পাশাপাশি চলে অসামাজিক কর্মকাণ্ড। তৈরি হয় এক ভীতিকর পরিবেশ।
স্থানীয়রা জানান, এটি শুধু ইট-সিমেন্টের একটি স্থাপনা নয়, টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। জেলার গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি দ্রুত সংস্কার করা জরুরি।
জানা গেছে, টাঙ্গাইল শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ৩৫ শতাংশ জমির ওপর "টাঙ্গাইল টাউন হল" নামে মিলনায়তনটি নির্মিত হয়। ১৯৭৬ সালের ১৬ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতির শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আবুল ফজল এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৭৮ সালের ২ এপ্রিল ঢাকা বিভাগের কমিশনার খানে আলম খান এটি উদ্বোধন করেন। পরবর্তীকালে টাঙ্গাইল পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান সামছুল হকের উদ্যোগে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় "ভাসানী হল"। প্রায় এক হাজার আসনবিশিষ্ট এই মিলনায়তনটি একসময় দেশের অন্যতম বৃহৎ ও দৃষ্টিনন্দন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। এরপর থেকেই এটি জেলার অন্যতম সাংস্কৃতিককেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায় এবং অনন্য ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু প্রায় অর্ধশত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক ভবনটি সংস্কারের অভাবে বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। প্রায় এক যুগ আগে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
বিশিষ্ট কবি ও সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব মাহমুদ কামাল বলেন, কয়েক দশক ধরে টাঙ্গাইলের নাটক, সংগীত, আবৃত্তি, বইমেলা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের মহামিলনক্ষেত্র ছিল এটি। হলটি মওলানা ভাসানীর নামে থাকায় বিগত সরকার সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের দাবি, ভাসানী হলটি পুনর্নির্মাণ কিংবা সংস্কার করা হোক।
কালচারাল রিফর্মেশন ফোরাম টাঙ্গাইলের সভাপতি আবুল কালাম মোস্তফা লাবু বলেন, টাঙ্গাইলকে বলা হয় সাংস্কৃতিক নগরী। কিন্তু এই নগরীতে একটি সুন্দর ও মানসম্মত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নেই। এক সময় ভাসানী হল ঘিরে যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চলত, তা বন্ধ হয়ে গেছে এক যুগ আগেই। তাই দ্রুত ভাসানী হল পুনঃনির্মাণ জরুরি হয়ে উঠেছে।
টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব ও মওলানা ভাসানীর দৌহিত্র মাহমুদুল হক সানু বলেন, ভাসানী হল সংস্কার এখন সময়ের দাবি। শুধুমাত্র মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নামে নামকরণ করা হয়েছে বিধায় দীর্ঘদিন ধরে হলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। টাঙ্গাইল সদর আসনের সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু গত ১২ জুন হলটি পরিদর্শন করেছেন। আশা করছি, বর্তমান সরকার খুব দ্রুতই এই মিলনায়তনটি আধুনিক ও যুগোপযোগী করে সংস্কার করার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
টাঙ্গাইল ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান খান বলেন, এক সময় ভাসানী হল টাঙ্গাইল সাংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অযত্ন, অবহেলা, সংস্কারের অভাবে অর্ধশতবছরের পুরোনো টাঙ্গাইল ভাসানী হল মিলনায়তনটি এখন পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে। মাদকের ছোবল এবং কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত থেকে মুক্তি পেতে হলে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে মুখরিত রাখতে হবে। তাই সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে গতিশীল করতে ভাসানী হল সংস্কার বা পুনঃনির্মাণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
টাঙ্গাইল-০৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ভাসানী হল ছিল টাঙ্গাইলের শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম কেন্দ্র। এই হলকে ঘিরে নাটক, সঙ্গীত, আলোচনা সভাসহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত হতো। ফলে টাঙ্গাইল সারা দেশে একটি সাংস্কৃতিক নগরী হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে ভাসানী হলটি তার জৌলুস হারিয়েছে।
তিনি বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঐতিহাসিক এই ভবনটি কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছিল। ফলে ভবনের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। আমি ১২ জুন হলটি পরিদর্শন করেছি। মাওলানা ভাসানীর স্মৃতি ধরে রাখতে আশা করছি, খুব দ্রুতই হাসানী হল মিলনায়তনটি আধুনিক ও যুগোপযোগী করে সংস্কার করে গড়ে তোলা হবে।
ভোরের আকাশ/ এনউব