শিরোনাম
অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে মানবাধিকারকে রাখতে হবে : জাতিসংঘে আইরিন খানস্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমেই সুস্থ প্রজন্ম গড়ে ওঠে: মীর শাহে আলমফের দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের গোলাবর্ষণবিদ্যুৎখাতে লুটপাট করতেই দায় মুক্তির আইন পাস করেছিল আ.লীগ: রিজভীসিইসির সঙ্গে বৈঠকে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রতিনিধি দলযুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের আগে ভিসার নিয়মকানুন জেনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে দেশটির দূতাবাসনাগরিক না হয়েও নির্বাচনে ভোট দেয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি যুবকের বিরুদ্ধে মামলারপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীঅর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে মানবাধিকারকে রাখতে হবে : জাতিসংঘে আইরিন খানস্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমেই সুস্থ প্রজন্ম গড়ে ওঠে: মীর শাহে আলমফের দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের গোলাবর্ষণবিদ্যুৎখাতে লুটপাট করতেই দায় মুক্তির আইন পাস করেছিল আ.লীগ: রিজভীসিইসির সঙ্গে বৈঠকে ১১ দলীয় ঐক্যের প্রতিনিধি দলযুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের আগে ভিসার নিয়মকানুন জেনে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে দেশটির দূতাবাসনাগরিক না হয়েও নির্বাচনে ভোট দেয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি যুবকের বিরুদ্ধে মামলারপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী

পানি নামতেই ভেসে উঠছে ধ্বংসস্তূপ

রাঙামাটির দুর্গত মানুষের এখন পুনর্বাসনই সবচেয়ে বড় আশা

রাঙামাটি প্রতিনিধি

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬, ৩:৫৫ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি : ভোরের আকাশ
ছবি : ভোরের আকাশ

কয়েকদিন আগেও চারদিকে ছিল শুধু উত্তাল পানি, পাহাড়ি ঢল আর মানুষের আর্তনাদ। আজ সেই পানি ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে। 

কিন্তু পানি সরে যেতেই রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি ও দুর্গম ফারুয়া ইউনিয়নে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। কোথাও কাদা আর পলির স্তূপে চাপা পড়েছে বসতভিটা, কোথাও পাহাড়ধসে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে ঘরবাড়ি, আবার কোথাও কৃষকের সবুজ ফসলি জমি পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে।

বন্যার পানি কমতে শুরু করায় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া হাজারো মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফিরছেন। কিন্তু ঘরে ফিরে অনেকেই দেখছেন; ঘর আর আগের জায়গায় নেই, রান্নাঘর ভেঙে গেছে, উঠানজুড়ে কোমরসমান কাদা, নলকূপ ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে, ঘরে নেই একমুঠো খাবারও। তাই পানি কমলেও তাদের দুর্ভোগ কমেনি; বরং শুরু হয়েছে বেঁচে থাকার আরও কঠিন সংগ্রাম।

রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জেলার ৩০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৯৮০ জন মানুষ অবস্থান করছেন। পানি নেমে যাওয়ায় অনেকে বাড়ি ফিরলেও অসংখ্য পরিবার এখনো আশ্রয়কেন্দ্রেই দিন কাটাচ্ছে। কারণ তাদের বসতঘর আর বসবাসের উপযোগী নেই।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষদের জন্য তিন বেলা খাবার, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন সুবিধা, স্যালাইন ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বিজিবি, বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুর্গত এলাকায় ত্রাণ সহায়তা অব্যাহত রয়েছে।

তবে দুর্গম ফারুয়া, বাঘাইছড়ি ও বরকলের অনেক এলাকায় এখনো সহায়তা পৌঁছানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। পাহাড়ি ঢলে রাইংখ্যং নদীর তীব্র স্রোত এবং সীমান্ত সড়কের বিভিন্ন অংশ ভেঙে যাওয়ায় প্রথমদিকে নৌপথেও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বর্তমানে পানি কমে যাওয়ায় সেনাবাহিনী, বিজিবি ও প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে দুর্গম এলাকাগুলোতে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সব পরিবার এখনো সমানভাবে সহায়তা পাচ্ছে না।

জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, এবারের দুর্যোগে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মোট ১৩৫টি স্থানে পাহাড়ধস হয়েছে। এর মধ্যে বিলাইছড়িতে ৩৭টি, কাপ্তাইয়ে ৩২টি, কাউখালীতে ৩০টি, নানিয়ারচরে ১৮টি, রাঙামাটি সদরে ১৩টি, লংগদুতে ৪টি এবং বাঘাইছড়িতে ৩টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় রাঙামাটি সদর, বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়িতে তিনজনের প্রাণহানির তথ্য নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন।

গত দুই দিন ধরে ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে রোদের দেখা মেলায় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও ভাঙা সড়ক, কাদামাটি, ক্ষতিগ্রস্ত সেতু এবং বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা এখনো স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বড় বাধা হয়ে আছে।

এদিকে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নিয়মিত ত্রাণ বিতরণ ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করছেন রাঙামাটি-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। তিনি বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি ও অন্যান্য দুর্গত এলাকায় গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং দ্রুত পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

দুর্যোগে সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে কৃষি ও জীবিকার ওপর। বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। অনেক কৃষক বছরের একমাত্র সম্বল হারিয়ে এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কৃষি পুনর্বাসন, বীজ, সার এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত না হলে আগামী মৌসুমেও উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং খাদ্যসংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করবে।

একই সময়ে কাপ্তাই হ্রদে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন মৌসুম চলায় বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) ও জেলা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞার কারণে মাছ ধরা বন্ধ রয়েছে। ফলে হ্রদনির্ভর প্রায় ২২ হাজার জেলে পরিবার আয়হীন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে ভেঙে পড়া যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে কাঠ ব্যবসাও প্রায় স্থবির। কৃষি, মৎস্য ও কাঠ—এই তিনটি প্রধান জীবিকার ওপর নির্ভরশীল হাজারো পরিবার আজ চরম অর্থনৈতিক সংকটে।

দুর্যোগের আরেকটি বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি। এনজিও থেকে ঋণ নেওয়া বহু পরিবার এখন দুশ্চিন্তায়—যেখানে পরিবারের খাবার জোগাড় করাই কঠিন, সেখানে কিস্তি পরিশোধ কীভাবে সম্ভব? দুর্গতদের দাবি, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি আদায় সম্পূর্ণ স্থগিত রাখতে হবে।

সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ানও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বার্থে এনজিওগুলোর ঋণের কিস্তি আদায় সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানবিক বিবেচনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের মতে, এখন শুধু ত্রাণ দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত পুনর্বাসন কর্মসূচি। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য নিরাপদ স্থানে নতুন ঘর নির্মাণ, বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি মেরামতের অনুদান, কৃষকদের জন্য পুনর্বাসন প্যাকেজ, জেলে ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিশেষ আর্থিক সহায়তা, ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি স্থগিত, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

আরও পড়ুন

বন্যাদুর্গতদের ত্রাণের পাশাপাশি পুনর্বাসনে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার : প্রতিমন্ত্রী অমিত

পাহাড়ের মানুষ বলছেন, তারা কারও করুণা নয়, বাঁচার সুযোগ চান। দুর্যোগ তাদের ঘর, ফসল আর জীবিকা কেড়ে নিয়েছে; কিন্তু বেঁচে থাকার ইচ্ছাশক্তি কেড়ে নিতে পারেনি। 

সরকার, বেসরকারি সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি একসঙ্গে এগিয়ে আসে, তবে ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেও আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে রাঙামাটির পাহাড়ি জনপদের হাজারো পরিবার।

ভোরের আকাশ/র.ই
 

দীপেন দেওয়ান

শেয়ার করুন: