ত্যাগ, আদর্শ ও জনসেবার প্রতিচ্ছবি বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার

কিছু মানুষ জন্মান ইতিহাস গড়তে, আর কিছু মানুষ নিজের কর্ম ও ত্যাগে হয়ে ওঠেন একেকটি জীবন্ত ইতিহাস। মেঘনা-শীতলক্ষ্যা বিধৌত নরসিংদীর মাটিতে তেমনই এক পরিচিত নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার। তিনি শুধু একজন রাজনীতিক নন; মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষকতা, জনসেবা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন ত্যাগী ও জনসম্পৃক্ত নেতা হিসেবে।
রণাঙ্গনের অগ্নিপুরুষ
১৯৭১ সালের রক্তঝরা দিনগুলোতে যখন স্বাধীনতার জন্য পুরো দেশ লড়াই করছিল, তখন তরুণ তোফাজ্জল হোসেনও ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে। একটি স্বাধীন ভূখণ্ড, একটি লাল-সবুজ পতাকা ও একটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নই ছিল তাঁর লড়াইয়ের প্রেরণা। মুক্তিযুদ্ধের সেই সাহসী ভূমিকার কারণেই তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয়। পরবর্তীতে নরসিংদী জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার ও কল্যাণে কাজ করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা আরও দৃশ্যমান হয়।
স্বাধীনতার পর দেশ গড়ার সংগ্রামে নিজেকে যুক্ত করেন শিক্ষকতা পেশায়। শিবপুর পাইলট মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন তিনি। হাতে চক-ডাস্টার নিয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও নৈতিকতার আলোয় গড়ে তোলার কাজ করেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁর এই ভূমিকার কারণেই মানুষের কাছে তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘মাস্টার’ নামে। রাজনীতির ব্যস্ততা ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষকতার আদর্শকে তিনি ধারণ করেছেন। ফলে রাজনীতির মাঠেও তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে ‘মাস্টার’ শব্দটি হয়ে ওঠে শ্রদ্ধা ও আস্থার প্রতীক।
২৯ বছরের রাজনৈতিক পথচলা
নরসিংদীর রাজনীতিতে তোফাজ্জল হোসেন মাস্টারের পথচলা দীর্ঘ ও সংগ্রামময়। প্রায় ২৯ বছর, মতান্তরে ২৭ বছর, তিনি নরসিংদী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। দলের নানা সংকট ও কঠিন সময়ে তিনি নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছেন বলে তাঁর অনুসারীদের দাবি। মামলা-হামলা, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা কিংবা রাজপথের আন্দোলন—বিভিন্ন সময়ে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত রাখার চেষ্টা করেছেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ। দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন আস্থা ও ঐক্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।
চক্রধা থেকে জেলা পরিষদ
জনসম্পৃক্ত রাজনীতির পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তোফাজ্জল হোসেন মাস্টার। শিবপুরের চক্রধা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও বেশি জনসম্পৃক্ত করে তোলে। মানুষের সমস্যা ও প্রত্যাশার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকার সুযোগ পান তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে নরসিংদী জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্বও পান তিনি। তাঁর সমর্থকদের কাছে এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত।
ত্যাগ ও আদর্শের রাজনীতি
ক্ষমতার রাজনীতিতে অনেক সময় পরিস্থিতির সঙ্গে পাল্টে যায় মানুষের অবস্থান। তবে তোফাজ্জল হোসেন মাস্টারের রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে সামনে আসে দীর্ঘ সময় ধরে একই রাজনৈতিক আদর্শে থাকার বিষয়টি। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে শিক্ষকতা, সেখান থেকে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও জনসেবা—জীবনের প্রতিটি পর্যায়েই মানুষের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করেছেন তিনি। বয়স বেড়েছে, চুলে রুপালি ছাপ পড়েছে; কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার অভিজ্ঞতা ও মানুষের জন্য কাজ করার আকাঙ্ক্ষা এখনও তাঁর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নরসিংদীর রাজনৈতিক অঙ্গনে তোফাজ্জল হোসেন মাস্টারের দীর্ঘ পথচলা তাই কেবল একটি ব্যক্তির রাজনৈতিক জীবনের গল্প নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, শিক্ষকতার আদর্শ, তৃণমূলের রাজনীতি ও জনসেবার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। তাঁর এই পথচলা আগামী প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য কতটা অনুপ্রেরণার হয়ে উঠবে, সেটি সময়ই বলে দেবে। তবে নরসিংদীর রাজনৈতিক ইতিহাসে বীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন মাস্টারের দীর্ঘ কর্মজীবন যে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
ভোরের আকাশ/সু.পা