আমজাদ হোসেন, নরসিংদী
প্রকাশ : ১১ মে ২০২৫ ০৩:০২ এএম
রপ্তানির নতুন দুয়ারে বাংলাদেশের কাঁঠাল
বাংলাদেশ তথা আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল। আর ক’দিন পরেই পুরোদমে শুরু হবে কাঁঠালের মৌসুম। দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই ফলটির উৎপাদন হয়ে থাকে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকায় লালমাটিতে এবং মধ্যাঞ্চালের এটেল দোয়াশ মাটিতে এর উৎপাদন হয় অধিক পরিমাণে। স্বাদে ঘ্রাণে অনন্য এই ফলটি দেশের চাহিদা পূরণ করে এখন বিদেশে রপ্তানির নতুন দুয়ার খুলতে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশে কাঁঠাল-ই একমাত্র ফল। যা ধনী গরীব সবাই খেতে পারেন। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলটি তুলনামূলক অন্য সব ফলের চেয়ে সস্তায় পাওয়া যায়। ভরমৌসুমে গ্রামাঞ্চলে এই ফলটি পাওয়া যায় অবারিত এবং অনেকটা অবহেলিত অবস্থায়। দেশের অভ্যন্তরে এর চাহিদা থাকলেও উৎপাদনের পরিমাণ অধিক থাকায় এই ফলটি তুলনামূলক সস্তায় বিক্রি হয়। কাঁঠালের যখন পুরোমৌসুম শুরু হয় তখন গ্রামাঞ্চলে এর দাম অনেক কম থাকে। এমনকি তখন একেকটা কাঠাল বিক্রি হয় মাত্র ২০ থেকে ৫০ টাকা করে।
কাঁঠাল বিক্রি করেন এমন বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, কাঁঠাল পাকা শুরু হয় বৈশাখ মাস থেকেই। তবে এই সময়টায় খুব অল্প পরিমাণে পাকে, তখন কাঁঠালের তুলনায় বাজারে চাহিদা থাকে বেশি। এজন্য এই সময়টায় কাঁঠালের দামও থাকে অনেক বেশি। একেকটা পাকা কাঁঠালের দাম ওঠে তখন ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু যখন জৈষ্ঠ্য- আষাঢ় মাস চলে তখন গাছের প্রায় সব কাঁঠাল পেকে যায়। এতে করে বাজারে কাঁঠালের আমদানি হয় বেশি, আমদানির তুলনায় চাহিদা কম থাকায় বিক্রিও করতে হয় কম দামে। তখন ২০/৫০ টাকায় একেকটা কাঁঠাল বিক্রি করতে হয়। একটা পর্যায়ে ক্রেতার অভাবে খুব সস্তায় বিক্রি করতে হয়। বাজারে এনে বিক্রি করে পরিবহন খরচ উঠানোটাও অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকে তখন কাঁঠাল বিক্রি না করে বাড়িতে থাকা গৃহপালিত প্রাণিকে এই কাঁঠাল খাইয়ে থাকে।
পুষ্টিবিদদের মতে, কাঁঠাল কাঁচা এবং পাকা দুইভাবেই খাওয়া যায়। কাঁঠালের বীজও খাওয়া যায়। এর বীজ অত্যন্ত সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁঠালে শক্তির পরিমাণ ৩৯৭ কিলো ক্যালরি, খাদ্য আঁশ ২.০০ গ্রাম, চিনি ১৯.০৮ গ্রাম, স্নেহ ৬৪ গ্রাম, প্রোটিন ১.৭৫ গ্রাম, ভিটামিন এ ৫ মাইক্রোগ্রাম, ভিটা ক্যারোটিন ৬১ মাইক্রোগ্রাম, থায়ামিন (বি১) ০.১০৫ মিলিগ্রাম এবং রিবোফ্লাভিন (বি২) ০.৫৫ মিলিগ্রাম।
এছাড়া, পুষ্টি গবেষণা কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা কাঁঠালে থাকে ১.৮ গ্রাম প্রোটিন, ৯.৯ গ্রাম শর্করা, ৩০ মিলিগ্রাম চর্বি, ২৯২ আই ইউ ভিটামিন এ, ০.১৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি, ২১.৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ২৬ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম এবং ১.৭ মিলিগ্রাম লোহা বা আয়রন।
কৃষি গবেষকদের মতে, কাঁঠাল মূলত একপ্রকার হলুদ রঙের সুমিষ্ট গ্রীষ্মকালীন ফল। এর বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus heterophyllus যা ডুমুর পরিবারের প্রজাতি এবং আর্টোকার্পাস গোত্রের একটি ফল। বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকায় কাঁঠাল হয়। তবে দেশের যেসব অঞ্চলে কাঁঠাল অধিক পরিমাণে হয়ে থাকে এরমধ্যে নরসিংদী জেলা অন্যতম। এখানকার উৎপাদিত কাঁঠাল জেলার চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে সাপ্লাই দেয়া হয়। এছাড়া, নরসিংদীর কাঁঠাল তুলনামূলকভাবে অধিক সুস্বাদু এবং পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ।
এবিষয়ে জানতে কথা হয় নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষক অফিসার মো: আবদুল হাই- এর সঙ্গে।
তিনি জানান, বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকায়ই এখন কমবেশি কাঁঠাল হয়। কারণ প্রকৃতিগতভাবেই বাংলাদেশের মাটি কাঁঠালের জন্য উপযোগি। তবে তুলনামূলক টিলা বা উঁচু অঞ্চল এবং লালমাটির এলাকায় কাঁঠালের ফলন বেশি হয়। বিশেষ করে নরসিংদী, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর, দিনাজপুর, পাবনা, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি এবং কুমিল্লা এলাকায় কাঁঠালের ফলন অধিক পরিমাণে হয়ে থাকে। এরমধ্যে মাটিরগুণে নরসিংদীর কাঁঠাল তুলনামূলক অধিক সুস্বাদু।
তিনি জানান, গত মৌসুমে নরসিংদী জেলায় ১৩ শত ১৩ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩৫ হাজার ২৫৫ মেট্রিক টন কাঁঠাল উৎপাদন হয়েছিল এবং এবছর আরো বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, এবারের মৌসুমে কাঁঠালের জন্য আবহাওয়া অনেকটা অনুকূল।
রপ্তানির বিষয়ে তিনি জানান, গতবছর নরসিংদীতে উৎপাদিত কাঁঠাল জেলার চাহিদা মিটিয়ে প্রায় ৯৭০ মেট্রিক টন রপ্তানি করা হয়েছে। রপ্তানির বড় একটা অংশ হলো দেশের বাইরে, বিশেষ করে ইউরোপ এবং মিডলইস্টের বিভিন্ন দেশে। তবে এবছর সরকারিভাবে চীনে কাঁঠাল রপ্তানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এতে করে আমাদের দেশের কাঁঠাল আর অবহেলিত হয়ে থাকবে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানির ফলে আমাদের জাতীয় ফলের চাহিদা দিন দিন বেড়েই যাবে।
ভোরের আকাশ/এসআই