স্বাস্থ্য প্রশাসন

আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধের প্রভাব: ইন্টার্নশিপ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ২৯৫ বিদেশি শিক্ষার্থী

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের লাইসেন্স স্থগিত হওয়ার পর সেখানে অধ্যয়নরত প্রায় ২৯৫ জন বিদেশি মেডিকেল শিক্ষার্থী চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। হাসপাতালটির চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাদের ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করা এবং নিজ নিজ দেশে পেশাগত স্বীকৃতি পাওয়া নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে হাসপাতালটির নিয়মিত রোগীরাও চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

শিক্ষার্থী ও রোগীদের ভবিষ্যৎ এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। হাসপাতালটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হলে রোগীরা অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারলেও মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নেই।

নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর লাইসেন্স বাতিল

গত ২৭ মে হাসপাতালটির প্রসূতি ওয়ার্ডে ছয় নবজাতকের আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। ঘটনার তদন্তে প্রাথমিকভাবে অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে গত ১১ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করে। একই সঙ্গে নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ এবং চিকিৎসাধীন রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর অথবা ছাড়পত্র দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। এরপর থেকেই হাসপাতালটির নিয়মিত চিকিৎসাসেবা কার্যত বন্ধ রয়েছে। যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাইসেন্স পুনর্বহালের জন্য আইনি প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে।

আবেদন নিয়ে ভিন্নমুখী বক্তব্য

আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের পরিচালক (কোম্পানি অ্যাফেয়ার্স) তারিকুল ইসলাম মুকুল বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিবের কাছে লাইসেন্স পুনর্বহালের আবেদন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যেসব আপত্তি ছিল, সেগুলো সংশোধনের পরই আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত কুমার বিশ্বাস বলেন, লাইসেন্স বাতিলের পর ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ থাকলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আবেদন তাঁদের কাছে পৌঁছায়নি। ফলে আবেদন করা হয়েছে কি না, তা নিয়েই সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তি।

সবচেয়ে বড় সংকটে বিদেশি শিক্ষার্থীরা

মেডিকেল কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ভারত, মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ২৯৫ জন বিদেশি শিক্ষার্থী আদ্-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজে অধ্যয়ন করছেন। তাঁদের অনেকেই বর্তমানে ইন্টার্নশিপ পর্যায়ে রয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, নিজ নিজ দেশের মেডিকেল কাউন্সিলের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত মেডিকেল কলেজ-সংযুক্ত হাসপাতালেই ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করতে হয়। অন্য কোনো হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ করলে তা দেশে স্বীকৃতি না পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে হাসপাতালের কার্যক্রম দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে তাদের শিক্ষাজীবন ও পেশাগত ভবিষ্যৎ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ সংকট নিরসনে বিদেশি শিক্ষার্থীরা সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে স্মারকলিপি দিয়ে মানবিক ও একাডেমিক দিক বিবেচনায় দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের আশ্বাস

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন বলেন, আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজের বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করবে হাসপাতালের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কী সিদ্ধান্ত নেয় তার ওপর। তবে শিক্ষার্থীদের বিষয়টি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে এবং এ নিয়ে এখনই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

রোগীরাও পড়েছেন ভোগান্তিতে

স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবার জন্য পরিচিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে অনেক রোগী, বিশেষ করে প্রসূতি সেবাগ্রহীতারা নিয়মিত চিকিৎসা নিতেন। হাসপাতালটির কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তারা এখন বিকল্প প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

এদিকে হাসপাতালটির লাইসেন্স পুনর্বহালের দাবিতে সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তারা বলেন, নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি হাসপাতালের ভবিষ্যৎ নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি, যাতে সাধারণ রোগী ও শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।

দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্তের আহ্বান

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত যেমন জরুরি, তেমনি প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ভবিষ্যৎ রক্ষায়ও দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শত শত শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ারে পড়তে পারে।

বর্তমানে হাসপাতালটির লাইসেন্স পুনর্বহাল হবে কি না এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ কীভাবে সম্পন্ন হবে— সেই প্রশ্নের উত্তরেই তাকিয়ে আছেন শিক্ষার্থী, অভিভাবক, রোগী এবং সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, "আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিষয়টি সম্পর্কে আমার কাছে এখন কোনো তথ্য নেই। তাই এ মুহূর্তে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে পারছি না।"

ভোরের আকাশ/সু.পা

আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধের প্রভাব: ইন্টার্নশিপ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ২৯৫ বিদেশি শিক্ষার্থী | স্বাস্থ্য কথা