আইন জটিলতায় আটকে কিডনি প্রতিস্থাপন কার্যক্রম, বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘ষষ্ঠ বাংলাদেশ কোরিয়া ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স’ উপলক্ষে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বাংলাদেশের কিডনি প্রতিস্থাপন পরিস্থিতি, সমস্যা ও সমাধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এ সেমিনারের শিরোনাম ছিল ‘জীবিত এবং মৃত দাতার কিডনি প্রতিস্থাপন, ২০২৬’।
উন্নত বিশ্বে প্রায় ৭০ শতাংশ কিডনি প্রতিস্থাপনই মরণোত্তর (ক্যাডাভেরিক) দাতার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে বাংলাদেশে আইনি জটিলতা ও জনসচেতনতার অভাবে এই কার্যক্রম এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। ফলে দেশে প্রতি বছর হাজারো মানুষ কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি
সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন—
কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন রুবেল, কোরিয়ান কিডনি বিশেষজ্ঞ ডা. কুরি এন এবং অস্ট্রেলিয়ান কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জেরেমি চ্যাপম্যানসহ আরও অনেকে।
উন্নত বিশ্বে মরণোত্তর অঙ্গদানই প্রধান ব্যবস্থা
বিশেষজ্ঞরা বলেন, উন্নত দেশে ‘ব্রেইন ডেথ’ হওয়া রোগীদের অঙ্গ সংরক্ষণ ও প্রতিস্থাপনের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ও শক্তিশালী আইনি কাঠামো রয়েছে। সেখানে মৃত্যুর আগেই অঙ্গদানের ইচ্ছা প্রকাশেরও প্রচলন রয়েছে। তাদের মতে, জীবিত নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে কিডনি গ্রহণে দাতার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে। তাই উন্নত দেশগুলোতে মরণোত্তর অঙ্গদানকেই প্রধান বিকল্প হিসেবে দেখা হয়।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি
তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার মানুষ কিডনি বিকল হয়ে পড়েন। এর মধ্যে অন্তত ১০ হাজার রোগীর জরুরি কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন হয়। কিন্তু সীমিত সুযোগের কারণে বছরে মাত্র প্রায় ২৫০টি কিডনি প্রতিস্থাপন সম্ভব হচ্ছে।
আইনি জটিলতা ও সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতি বছর প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৫০০ রোগী চিকিৎসার জন্য ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইন সংশোধন করা গেলে দেশের মধ্যেই অধিক সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা সম্ভব হতো, যা বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও স্বাস্থ্যখাতে আস্থা বৃদ্ধি করত।
আইন ও দাতা সংকট
বাংলাদেশে ১৯৯৯ সালে ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন’ পাস হয়। ২০১৮ সালে এটি সংশোধন করা হলেও তা এখনো সীমিত। বর্তমানে নির্ধারিত ২৩ জন নিকটাত্মীয় ছাড়া অন্য কেউ কিডনি দান করতে পারেন না। অথচ ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশে মানবিক বা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অ-আত্মীয়দের কাছ থেকেও অঙ্গদান সম্ভব। এই সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে তীব্র দাতা সংকট তৈরি হয়েছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও উদ্বেগ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ৮৫ কোটিরও বেশি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ কোটি মানুষ জানেনই না যে তারা এই রোগে আক্রান্ত। প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ আকস্মিক কিডনি বিকলতায় আক্রান্ত হন, যার ৮৫ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশের নাগরিক। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ২০৪০ সালের মধ্যে চিকিৎসার অভাবে ৫০ লাখের বেশি রোগীর মৃত্যু হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আহ্বান
সেমিনারে বক্তারা বলেন, কিডনি প্রতিস্থাপন বৃদ্ধি করতে হলে আইন সহজীকরণ, মরণোত্তর অঙ্গদান বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি।
ভোরের আকাশ/সু.পা



