স্বাস্থ্য প্রশাসন

অ্যালকোহল ছাড়াও ওষুধ-সাপ্লিমেন্টে হতে পারে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি

ছবি: সংগৃহীত

লিভারের অসুখ বা ক্ষতির কথা বলতেই কি আপনার কেবল মদ্যপানের কথা মনে পড়ে? প্রতিদিন সাধারণ মাথাব্যথা, জ্বর কিংবা সর্দি-কাশিতে নিজের ইচ্ছামতো যে ওষুধগুলো খাচ্ছেন, অথবা ‘ভেষজ’ ও ‘প্রাকৃতিক’ ভেবে নিশ্চিন্তে যে সাপ্লিমেন্ট নিচ্ছেন, সেগুলোই নীরবে আপনার লিভারের মারাত্মক ক্ষতি করছে না তো?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যালকোহল ছাড়াও কিছু ওষুধ, হার্বাল পণ্য ও ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টের কারণে লিভারের ক্ষতি হওয়ার কথা জানা যায়। এ ধরনের ক্ষতিকে বলা হয় ‘ড্রাগ-ইনডিউসড লিভার ইনজুরি’ বা ডিআইএলআই। এটি কখনো কখনো গুরুতর হয়ে তীব্র লিভার ফেইলিওর পর্যন্ত ঘটাতে পারে।

সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো, লিভারের ক্ষতি শুরু হলেও প্রথম দিকে সবসময় স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে সমস্যা শনাক্ত হওয়ার আগেই ক্ষতি অনেকটা এগিয়ে যেতে পারে। ভুল মাত্রায় ওষুধ খাওয়া, একই উপাদান থাকা একাধিক ওষুধ একসঙ্গে নেওয়া কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বিভিন্ন ওষুধ ও সাপ্লিমেন্ট একসঙ্গে সেবন করলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অ্যালকোহল নয়, ওষুধেও বিপদ
লিভারের ক্ষতির কথা উঠলেই অ্যালকোহলের কথা মনে আসে। তবে অ্যালকোহল ছাড়াও কিছু ওষুধ লিভারের ক্ষতির কারণ হতে পারে। সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ প্যারাসিটামল। জ্বর বা ব্যথার জন্য বহুল ব্যবহৃত এই ওষুধ নির্ধারিত মাত্রায় সাধারণত নিরাপদ। কিন্তু অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে মারাত্মক লিভার ক্ষতি, এমনকি লিভার ফেইলিওরও হতে পারে।

সমস্যা আরও বাড়তে পারে যখন একজন ব্যক্তি একই সময়ে একাধিক প্যারাসিটামলযুক্ত ওষুধ খান। অনেক সর্দি, কাশি ও ফ্লুর ওষুধেও প্যারাসিটামল থাকতে পারে। ফলে আলাদাভাবে প্যারাসিটামল খাওয়ার পাশাপাশি একই উপাদানযুক্ত ঠান্ডার ওষুধ গ্রহণ করলে অজান্তেই মোট মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। তাই একাধিক ওষুধ খাওয়ার আগে প্যাকেটের লেবেলে সক্রিয় উপাদানগুলো দেখে নেওয়া জরুরি। একই উপাদানযুক্ত একাধিক ওষুধ একসঙ্গে না খাওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA)।

‘হার্বাল’ বা ভেষজ হলেই কি নিরাপদ?
অনেকের ধারণা, প্রাকৃতিক বা হার্বাল পণ্যে রাসায়নিক ওষুধের মতো ক্ষতির আশঙ্কা নেই। কিন্তু এই ধারণা সবসময় ঠিক নয়। হার্বাল পণ্য ও ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট থেকেও লিভারের ক্ষতি হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে সেই ক্ষতি গুরুতর হয়ে তীব্র লিভার ফেইলিওর পর্যন্ত ঘটাতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে ওষুধ, হার্বাল পণ্য ও ডায়েটারি সাপ্লিমেন্টের কারণে লিভারের ক্ষতির বিষয়টি আলাদাভাবে নথিবদ্ধ করা হয়। এসব পণ্যের উপাদান ও ব্যবহার সম্পর্কে চিকিৎসককে পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানানো তাই গুরুত্বপূর্ণ।

ধরুন, মাথাব্যথার জন্য একটি ব্যথার ওষুধ খেলেন। এরপর সর্দি-কাশির জন্য আরেকটি ওষুধ এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি সাপ্লিমেন্ট নিলেন। প্রতিটি পণ্য আলাদাভাবে নিরাপদ মনে হলেও সবগুলো একসঙ্গে নেওয়া সবসময় নিরাপদ নাও হতে পারে। তাই চিকিৎসকের কাছে গেলে শুধু প্রেসক্রিপশনে থাকা ওষুধের কথা বললেই হবে না। নিজে থেকে কেনা ওভার-দ্য-কাউন্টার (OTC) ওষুধ, ভিটামিন, মিনারেল এবং হার্বাল সাপ্লিমেন্টের কথাও জানানো জরুরি।

যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
ওষুধের কারণে লিভারের ক্ষতির শুরুটা অনেক সময় সাধারণ অসুস্থতার মতো মনে হতে পারে। অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বমি বমি ভাব, বমি, ক্ষুধা কমে যাওয়া বা পেটে অস্বস্তি হতে পারে। সমস্যা বাড়লে প্রস্রাবের রং অস্বাভাবিক গাঢ় হতে পারে। চোখের সাদা অংশ বা ত্বক হলুদ হয়ে যেতে পারে। গুরুতর অবস্থায় বিভ্রান্তি বা মানসিক অবস্থার পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুরুতে কারও কারও প্রায় কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। এমনকি অতিরিক্ত প্যারাসিটামল গ্রহণের পরও গুরুতর ক্ষতির লক্ষণ কয়েক দিন পর প্রকাশ পেতে পারে।

লিভার সুস্থ রাখতে করণীয়
প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ওষুধ খাওয়া যাবে না। একই সঙ্গে একাধিক ওষুধ খাওয়ার আগে প্রতিটির সক্রিয় উপাদান দেখে নিতে হবে। একই উপাদান একাধিক ওষুধে রয়েছে কি না বুঝতে না পারলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

নিয়মিত যেসব ওষুধ, ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া হয়, সেগুলোর একটি তালিকা রাখা ভালো। চিকিৎসকের কাছে গেলে তালিকাটি দেখালে সম্ভাব্য ওষুধের পারস্পরিক প্রভাব বা একই উপাদানযুক্ত একাধিক ওষুধ গ্রহণের ঝুঁকি শনাক্ত করা সহজ হয়। ভুলবশত কোনো ওষুধ অতিরিক্ত খেয়ে ফেললে বা ওষুধ গ্রহণের পর অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে অতিরিক্ত প্যারাসিটামল গ্রহণের সন্দেহ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

ওষুধ শরীরের উপকারের জন্যই। তবে সঠিক ওষুধ, সঠিক মাত্রা এবং সঠিক ব্যবহারের নিয়ম না মানলে সেই ওষুধই কখনো কখনো লিভারের জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

ভোরের আকাশ/সু.পা

অ্যালকোহল ছাড়াও ওষুধ-সাপ্লিমেন্টে হতে পারে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি | স্বাস্থ্য কথা