স্বাস্থ্য প্রশাসন

চমেক হাসপাতালে রোগী হয়রানির অভিযোগ, সেবার আড়ালে চলছে অর্থ আদায়

ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান ভরসার স্থল। প্রতিদিন হাজারো রোগী চিকিৎসা নিতে এ হাসপাতালে এলেও সেবা গ্রহণের পথে নানা ধরনের অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। সরকারি হাসপাতালে স্বল্প খরচে কিংবা বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক রোগী ও তাদের স্বজনকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ডে কর্মরত কিছু অসাধু কর্মচারী, আয়া, ওয়ার্ডবয় এবং দালালচক্রের সদস্যরা রোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে অর্থ আদায় করছেন। ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, রোগীকে ওয়ার্ডে পৌঁছে দেওয়া, বেডের ব্যবস্থা করা কিংবা নিয়মিত সেবাযত্ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও অর্থ দাবি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রোগীর স্বজনরা।

সেবার আড়ালে অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন : রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পর থেকেই অতিরিক্ত খরচের চাপ শুরু হয়। ট্রলি ব্যবহার, রোগীকে নির্ধারিত ওয়ার্ডে স্থানান্তর কিংবা মেঝেতে অবস্থানের জন্য জায়গা নির্ধারণ করতেও টাকা দিতে হয়। অনেক সময় এসব অর্থকে ‘বকশিস’ বলা হলেও ভুক্তভোগীদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা স্বেচ্ছায় দেওয়া হয় না; বরং বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে আদায় করা হয়। একাধিক স্বজন জানান, অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু ব্যক্তি অসহযোগিতামূলক আচরণ করেন। ফলে রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা পেতে বিলম্বের শিকার হন।

রাত বাড়ার সঙ্গে বাড়ে অভিযোগ : চিকিৎসাধীন রোগীদের কয়েকজন স্বজন জানান, রাতের বেলায় এসব অনিয়ম আরও বেশি চোখে পড়ে। ড্রেসিং, ব্যান্ডেজ পরিবর্তন কিংবা রোগীর পরিচর্যার মতো সেবার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ দাবি করা হয়। কেউ আপত্তি করলে প্রয়োজনীয় সেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়েও প্রশ্ন : রোগীদের অভিযোগ, অনিয়ম শুধু ওয়ার্ডভিত্তিক অর্থ আদায়েই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি সরবরাহে পাওয়া যাওয়ার কথা এমন কিছু ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী বাইরে থেকে কিনে আনতে বলা হয়। পাশাপাশি হাসপাতাল এলাকায় সক্রিয় দালালচক্র রোগীদের বিভিন্ন বেসরকারি ফার্মেসি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ ছাড়া অনেক রোগীকে হাসপাতালের সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার না করে বাইরে থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের রোগীদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।

প্রশাসনের বক্তব্য : হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দালালচক্র ও বিভিন্ন অনিয়ম প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ ছাড়া অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা কঠিন বলে তারা উল্লেখ করেন। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, কোনো কর্মচারী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রোগীদের কাছ থেকে জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কঠোর নজরদারির দাবি : সাধারণ রোগী, স্বজন এবং সচেতন নাগরিকদের মতে, সাময়িক অভিযান চালিয়ে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে কার্যকর সিসিটিভি নজরদারি, সহজ অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।

তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় বিভিন্ন সিন্ডিকেট ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের মতে, সাধারণ মানুষের করের টাকায় পরিচালিত এই হাসপাতালকে প্রকৃত অর্থে জনবান্ধব ও দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে প্রশাসনিক কঠোরতার পাশাপাশি কার্যকর জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

ভোরের আকাশ/সু.পা

চমেক হাসপাতালে রোগী হয়রানির অভিযোগ, সেবার আড়ালে চলছে অর্থ আদায় | স্বাস্থ্য কথা