ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু ফগিং নয়, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে

ছবি: সংগৃহীত
বর্তমানে ফগিং কার্যক্রম পরিচালনার পরও ৭০ শতাংশের বেশি মশা বেঁচে থাকে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার প্রজননস্থল ধ্বংস বা ‘সোর্স রিডাকশন’। এমন মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজিস্ট ও মেডিকেল অফিসার ডা. মো. তারিকুল ইসলাম লিমন। ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় শনিবার (৪ জুলাই) তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. লিমন বলেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষাকালের রোগ নয়; এটি বছরব্যাপী জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। তাই শুধু ফগিংয়ের ওপর নির্ভর না করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য সমন্বয়, উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে ডেঙ্গু মোকাবিলা করতে হবে। তিনি বলেন, ফগিং তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা কার্যকর হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। মশার জন্মের উৎস শনাক্ত করে তা ধ্বংস করাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
ডা. লিমন আরও বলেন, বছরজুড়ে অ্যান্টোমোলজিক্যাল সার্ভেইলেন্স জোরদার করতে হবে। ব্রেটো ইনডেক্স, হাউজ ইনডেক্স ও কনটেইনার ইনডেক্সসহ বিভিন্ন সূচকের মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি চালিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় ঢাকার ওপর চাপ কমাতে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা, প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে রোগীর চাপ অনেকাংশে কমে আসবে।
জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যম ও ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, একসময় ‘মীনা’ কার্টুনের মাধ্যমে যেমন হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা হয়েছিল, তেমনি ডেঙ্গু প্রতিরোধেও দীর্ঘমেয়াদি ভিডিও, অ্যানিমেশন ও জনসচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।
সমাজে ডেঙ্গু নিয়ে প্রচলিত নানা ভুল ধারণার কথাও তুলে ধরেন ডা. লিমন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু শুধু নোংরা পানিতে হয়, শুধু বর্ষাকালেই হয়, জ্বর কমলেই রোগ সেরে যায়, প্লাটিলেট কমলেই রক্ত দিতে হয়, অ্যান্টিবায়োটিক খেলেই ভালো হয় বা পেঁপে পাতার রস প্লাটিলেট বাড়ায়—এসব ধারণার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। এসব ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে ব্যাপক জনসচেতনতা প্রয়োজন।
গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দেশে আরও বেশি প্রমাণভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা, পুষ্টি, সম্ভাব্য সাপ্লিমেন্ট এবং রোগের জটিলতা কমানোর উপায় নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে রোগীর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসার তথ্য নিয়ে একটি কাঠামোবদ্ধ ডেটাবেজ তৈরি ও বিশ্লেষণ করা গেলে জাতীয় পর্যায়ে ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।
ডেঙ্গুর পরিবর্তিত প্রকৃতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে ডেঙ্গু মূলত বর্ষাকালে দেখা গেলেও এখন সারা বছর রোগী পাওয়া যাচ্ছে এবং ভাইরাসের ধরনেও পরিবর্তন আসছে। তাই রেফারেল ব্যবস্থা ও চিকিৎসা প্রটোকল নিয়মিত হালনাগাদ করার পাশাপাশি নীতিনির্ধারণেও নতুন বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, সঠিক তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং সরকার ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে সফল হওয়া সম্ভব নয়।
আলোচনায় অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভিন এবং বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ভোরের আকাশ/সু.পা



