গরুর মাংস খাওয়ার আগে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি

ছবি: সংগৃহীত
গরুর মাংস নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এটি শুধু কোলেস্টেরল বাড়ায় এবং শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, পরিমিত পরিমাণে ও সঠিক উপায়ে খেলে গরুর মাংস হতে পারে শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস। তাই এটি উপকারী হবে নাকি ক্ষতির কারণ হবে, তা নির্ভর করে খাওয়ার পরিমাণ ও অভ্যাসের ওপর।
গরুর মাংস পুষ্টিগুণে অনন্য
গরুর মাংসে রয়েছে উচ্চমানের প্রোটিন, ভিটামিন বি২, বি৩, বি৬ ও বি১২। এছাড়া জিংক, সেলেনিয়াম, ফসফরাস এবং আয়রনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজও এতে পাওয়া যায়।
এসব উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। পাশাপাশি পেশি, দাঁত ও হাড় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ত্বক, চুল ও নখের স্বাস্থ্য ভালো রাখার পাশাপাশি রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ ও ক্ষত দ্রুত নিরাময়েও সহায়ক গরুর মাংস। এছাড়া মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তি কমিয়ে শরীরে কর্মোদ্যম বজায় রাখতেও এটি কার্যকর।
একজন সুস্থ মানুষের প্রতিদিন কতটা প্রোটিন প্রয়োজন, তা নির্ভর করে তার ওজনের ওপর। সাধারণত প্রতি কেজি ওজনের জন্য ১ গ্রাম প্রোটিন প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ, ৫০ কেজি ওজনের একজন মানুষের দৈনিক প্রায় ৫০ গ্রাম প্রোটিন গ্রহণ যথেষ্ট।
বিশেষ ক্ষেত্রে সতর্কতা
গর্ভবতী নারী ও মাসিক চলাকালীন নারীদের ক্ষেত্রে প্রোটিনের চাহিদা আরও বেশি হতে পারে। অন্যদিকে, কিডনির সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের জন্য প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হয়। সাধারণত প্রতি কেজি ওজনের জন্য ০.৫ গ্রাম প্রোটিন গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। ব্রিটেনের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্যমতে, সুস্থ মানুষেরও দিনে ৭০ গ্রামের বেশি এবং সপ্তাহে ৫০০ গ্রামের বেশি প্রোটিন গ্রহণ করা উচিত নয়।
খাওয়ার নিরাপদ পরিমাণ
পুষ্টিবিদ তাসনিম হাসিনের মতে, সপ্তাহে দুই দিন গরুর মাংস খাওয়া তুলনামূলক নিরাপদ। এই সময়ে সর্বোচ্চ তিন থেকে পাঁচ বেলা মাংস খাওয়া যেতে পারে। মোট পরিমাণ ১৫৪ গ্রামের মধ্যে রাখাই ভালো। সহজ হিসেবে, প্রতি বেলায় ঘরে রান্না করা মাঝারি আকারের দুই থেকে তিন টুকরার বেশি মাংস না খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
অসুস্থদের পরামর্শ
ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গরুর মাংস খাওয়া ঠিক নয়। সাধারণত চর্বিবিহীন অল্প পরিমাণ মাংস খেলে বড় ঝুঁকি থাকে না। তবে চিকিৎসক নিষেধ করলে তা এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
রান্নায় জরুরী বিষয় : বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রান্নার ধরনও গরুর মাংসের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে :
চর্বি ছেঁটে ফেলা: রান্নার আগে দৃশ্যমান চর্বি কেটে ফেললে কোলেস্টেরলের পরিমাণ অনেক কমে যায়।
ছোট টুকরো করা: মাংস ছোট টুকরো করলে চর্বি কম থাকে। কিমা বা বাটা মাংসে তুলনামূলক কম চর্বি পাওয়া যায়।
সেদ্ধ করে পানি ফেলে দেওয়া: কিছুক্ষণ সেদ্ধ করে উপরের তেলসহ পানি ফেলে দিলে অতিরিক্ত চর্বি কমে যায়।
তেল ও মসলা নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত তেল-মসলা দিয়ে ভুনা না করে ঝোল রান্না করা ভালো। খাওয়ার সময় ঝোল কম খাওয়ারও পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।
সবজি মিশিয়ে রান্না: মাংসের সঙ্গে পেঁপে, লাউ, মিষ্টি কুমড়া বা ফুলকপির মতো সবজি মিশিয়ে রান্না করলে তা আরও স্বাস্থ্যকর হয়।
ঝলসানো মাংস: গ্রিল বা শিক কাবাবের মতো ঝলসানো মাংসে তুলনামূলক কম চর্বি থাকে, কারণ আগুনে অতিরিক্ত চর্বি গলে পড়ে যায়।
অতিরিক্ত খেলে ঝুঁকি
অতিরিক্ত গরুর মাংস খেলে রক্তচাপ বাড়তে পারে। এতে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ধমনিতে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় অতিরিক্ত রেড মিট খাওয়ার সঙ্গে ক্যানসার, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তাই গরুর মাংসকে পুরোপুরি ক্ষতিকর ভাবার সুযোগ নেই। বরং সঠিক পদ্ধতিতে রান্না করে এবং পরিমিত পরিমাণে খেলে এটি হতে পারে একটি পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার। নিজের শারীরিক অবস্থা বুঝে পরিমাণ নির্ধারণ করাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। তথ্যসূত্র: বিবিসি
ভোরের আকাশ/সু.পা



