হামে মৃত শিশুদের ৯২ শতাংশই পায়নি হাম-রুবেলা টিকা

ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে চলতি বছর হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশই হাম-রুবেলা টিকার কোনো ডোজ পায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ সভায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত তথ্যে এ উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে শনিবার পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৭০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৬১৫ জন হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ৯৩ জন পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মারা গেছেন। রোগতত্ত্ববিদদের মতে, প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হওয়া মৃত্যুকেও হামজনিত মৃত্যু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গত ২২ ও ২৩ জুন শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে অনুষ্ঠিত ডব্লিউএইচও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের হাম-রুবেলাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিশনের সভায় বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরেন হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রম যাচাইয়ের জাতীয় কমিটির (এনভিসি) চেয়ারম্যান ও আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান। তাঁর সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং ডব্লিউএইচওর ঢাকা কার্যালয়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে, শিশুদের মধ্যে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতার অভাব এবং টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতাই বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় ৯ মাস বয়সে হাম-রুবেলা টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার বিধান থাকলেও, মারা যাওয়া শিশুদের মাত্র ৮ শতাংশ এই টিকার অন্তত একটি ডোজ পেয়েছিল। অর্থাৎ, ৯২ শতাংশ শিশু কোনো ডোজই পায়নি।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট মৃত্যুর মধ্যে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের হার সবচেয়ে বেশি—২৬ শতাংশ। এছাড়া ২ থেকে ৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৮ শতাংশ, ৯ থেকে ১১ মাস বয়সীদের মধ্যে ১৪ শতাংশ, ১ থেকে ২ বছর এবং ৫ থেকে ৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৩ শতাংশ করে, ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ৪ শতাংশ এবং ১৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ১২ শতাংশ মৃত্যু হয়েছে। এতে স্পষ্ট, শুধু শিশু নয়, বড়রাও হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন।
একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮ হাজার ২৬৬ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১১ হাজার ৫৯৪ জনের হাম পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। এ পর্যন্ত ৭৮ হাজার ২৮৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান জানান, কলম্বোতে উপস্থাপিত তথ্য জুন মাসের প্রথমার্ধ পর্যন্ত সংগ্রহ করা হয়েছিল। সে সময়ও দেখা যায়, মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশ হাম-রুবেলা টিকার কোনো ডোজ পায়নি। তাঁর ধারণা, জুনের শেষ সপ্তাহে মৃত্যুর সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে গেলেও টিকাবঞ্চিতের হার প্রায় একই রয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতার সমালোচনা করে বলেন, বহু শিশুকে টিকা না দিয়েও টিকা দেওয়ার দাবি করা হয়েছে এবং সাফল্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, তথ্য-উপাত্তে কারচুপি, নজরদারির অভাব এবং জবাবদিহিতার সংকটের কারণেই আজ শিশুদের এমন মূল্য দিতে হচ্ছে।
চলতি বছর বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড ও মালদ্বীপে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পরিস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে গত ২৫ জুন ডব্লিউএইচও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হাম মোকাবিলায় জরুরি ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানায়। পাশাপাশি বাংলাদেশের পরিস্থিতি সরেজমিনে মূল্যায়নের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠানোর অনুরোধও জানানো হয়েছে।
ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক কমিশন সদস্যদেশগুলোর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে হাম নির্মূল কার্যক্রমের অগ্রগতি মূল্যায়ন করে। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা থেকে সংগ্রহ করা হাম-রুবেলাসহ বিভিন্ন রোগের তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়।
ভোরের আকাশ/সু.পা



