মরণোত্তর অঙ্গদান চালু না হওয়ায় বাড়ছে বিদেশে চিকিৎসা

ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে আইনি জটিলতা ও জনসচেতনতার অভাবে মরণোত্তর অঙ্গদান কার্যক্রম এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে প্রতিবছর কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ রোগী ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে যেতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।
সোমবার (২৯ জুন) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘৬ষ্ঠ বাংলাদেশ-কোরিয়া ফ্রেন্ডশিপ কনফারেন্স’ উপলক্ষে আয়োজিত ‘জীবন্ত এবং মৃত দাতার কিডনি প্রতিস্থাপন, ২০২৬’ শীর্ষক সেমিনারে তারা এসব তথ্য তুলে ধরেন। সেমিনারের আয়োজন করে বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কিডনি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন রুবেল, কোরিয়ার কিডনি বিশেষজ্ঞ ডা. কুরি এন এবং অস্ট্রেলিয়ার কিডনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জেরিমি চ্যাপম্যানসহ দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।
বক্তারা বলেন, উন্নত দেশগুলোতে ‘ব্রেইন ডেথ’ হওয়া রোগীদের অঙ্গ সংরক্ষণ ও প্রতিস্থাপনের জন্য সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো এবং আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি মৃত্যুর আগে অঙ্গদানের অঙ্গীকার করার সংস্কৃতিও সেখানে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। ফলে মরণোত্তর অঙ্গদানই কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবিত আত্মীয়ের কাছ থেকে কিডনি নেওয়ার ক্ষেত্রে দাতার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে। সে কারণেই উন্নত বিশ্বে মৃত ব্যক্তির অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে আইন কিছুটা সংশোধন করা হলেও মরণোত্তর অঙ্গদান এখনো কার্যকরভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।
সেমিনারে জানানো হয়, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৪০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল হয়। এর মধ্যে অন্তত ১০ হাজার রোগীর জরুরি ভিত্তিতে কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু দাতা সংকট ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে দেশে বছরে গড়ে মাত্র ২৫০ জনের কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে।
এই সংকটের কারণে প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ রোগী বিদেশে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার করা গেলে এসব রোগীর বড় একটি অংশ দেশের মধ্যেই চিকিৎসা নিতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়বে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়ও কমবে।
বাংলাদেশে ১৯৯৯ সালে ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন’ প্রণয়ন করা হয়। পরে ২০১৮ সালে আইনটি আংশিক সংশোধন করা হলেও বর্তমান বাস্তবতায় তা যথেষ্ট নয় বলে মত দেন বক্তারা।
বর্তমান আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত ২৩ জন নিকটাত্মীয় ছাড়া অন্য কেউ কিডনি দান করতে পারেন না। অথচ ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ অনেক দেশে আত্মীয় না হলেও নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মানবিক কারণে কিডনি দানের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে এই সীমাবদ্ধতার কারণেই দাতা সংকট আরও তীব্র হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তারা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য তুলে ধরে সেমিনারে জানানো হয়, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ৮৫ কোটির বেশি মানুষ দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ কোটি মানুষ জানেনই না যে তারা এই রোগে ভুগছেন। প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ আকস্মিক কিডনি বিকল রোগে আক্রান্ত হন, যার ৮৫ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশের বাসিন্দা।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্বে ৫০ লাখের বেশি কিডনি বিকল রোগী চিকিৎসার অভাবে মারা যেতে পারেন। সেমিনারে বক্তারা দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন কার্যক্রম সম্প্রসারণে আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর করার পাশাপাশি মরণোত্তর অঙ্গদান বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ভোরের আকাশ/সু.পা



