অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং জরুরি: বিশেষজ্ঞরা

ছবি: সংগৃহীত
দেশে অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) বর্তমানে নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, ক্যানসার ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ ৭২ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যা দেশের মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ব্যাপক ব্যবহার, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং খাদ্যপণ্যের মোড়কে স্পষ্ট সতর্কবার্তা না থাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে দ্রুত বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের আয়োজনে ‘বাংলাদেশে ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল) বিষয়ক গণমাধ্যম অ্যাডভোকেসি ক্যাম্পেইন’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। কর্মশালায় কারিগরি সহায়তা দেয় গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর।
কর্মশালায় ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিভাগের পরিচালক ইকবাল মাসুদের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. মাহফুজুর রহমান মিলন, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী বিজ্ঞানী ড. আহমদ খায়রুল আবরার এবং বাংলাভিশনের সিনিয়র নিউজ এডিটর রুহুল আমিন রুশদ। এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পুষ্টিবিদ, আইনবিদ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজন উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে সংক্রামক রোগের তুলনায় অসংক্রামক রোগই মৃত্যুর প্রধান কারণ। হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, কিডনি জটিলতা ও ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭৪ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ ৭২ হাজার মানুষ এসব রোগে মারা যান, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ থেকে ৭১ শতাংশ।
আলোচনায় জানানো হয়, বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের ২০ শতাংশের বেশি উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণ এই রোগগুলোর অন্যতম কারণ। গত কয়েক দশকে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন এসেছে। ঐতিহ্যবাহী খাবারের পরিবর্তে চিপস, নুডলস, কোমল পানীয়, বিস্কুট, চকলেটসহ বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাদ্যের ব্যবহার বেড়েছে। এসব খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বি থাকায় হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে।
বক্তারা বলেন, শিশু ও কিশোররা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন ও বিপণনের কারণে তারা নিয়মিত জাঙ্ক ফুড ও চিনিযুক্ত পানীয় গ্রহণ করছে। ফলে শহরাঞ্চলের স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার হার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এতে অল্প বয়সেই টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তাদের মতে, বর্তমানে প্যাকেটজাত খাদ্যের পেছনে পুষ্টিগুণসংক্রান্ত তথ্য থাকলেও তা অধিকাংশ ভোক্তার কাছে সহজবোধ্য নয়। গ্রাম, মিলিগ্রাম বা শতকরা হিসাব সাধারণ মানুষের পক্ষে দ্রুত বোঝা সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে তথ্য ছোট অক্ষরে বা প্যাকেটের ভাঁজে লেখা থাকে। ফলে ভোক্তারা না জেনেই অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাদ্য কিনে ফেলেন।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং (এফওপিএল)-কে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় অন্যতম কার্যকর ও সাশ্রয়ী উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ব্যবস্থায় খাদ্যপণ্যের মোড়কের সামনের অংশেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে, খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা সম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে কি না। এতে ভোক্তারা কয়েক সেকেন্ডেই স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পেয়ে সচেতনভাবে খাদ্য নির্বাচন করতে পারবেন।
বক্তারা জানান, বিশ্বের ৪৪টি দেশে ইতোমধ্যে এফওপিএল চালু হয়েছে। চিলিতে কালো অষ্টভুজাকৃতির সতর্কবার্তা চালুর পর চিনিযুক্ত পানীয়ের ব্যবহার এবং শিশুদের অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ প্রায় ২৪ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে খাদ্যে সোডিয়ামের ব্যবহার ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। যুক্তরাজ্যের ‘ট্রাফিক লাইট’ পদ্ধতি এবং ফ্রান্সের ‘নিউট্রি-স্কোর’ পদ্ধতিও ইতিবাচক ফল দিয়েছে।
আলোচনায় আরও জানানো হয়, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বাধ্যতামূলক সতর্কবার্তাভিত্তিক ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং চালুর জন্য একটি খসড়া প্রবিধান তৈরি করেছে। এতে উচ্চমাত্রার চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাদ্যের মোড়কের সামনের অংশে সতর্কীকরণ চিহ্ন ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। এটি বাস্তবায়নের জন্য নতুন আইন নয়, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তই যথেষ্ট বলে মত দেন বক্তারা।
তারা বলেন, ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং শুধু একটি লেবেল নয়; এটি ভোক্তার জানার অধিকার নিশ্চিত করার একটি কার্যকর ব্যবস্থা। একই সঙ্গে এটি শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে দ্রুত এই ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন।
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস কর্মসূচির উদ্দেশ্য তুলে ধরে বলেন, খাদ্যপণ্যের মোড়কের সামনের অংশে সহজবোধ্য পুষ্টি-সংক্রান্ত তথ্য প্রদর্শন করা হলে ভোক্তারা স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য বেছে নিতে পারবেন এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এরপর সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার মো. মাহফুজুর রহমান মিলন ‘ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং ও ভোক্তা অধিকার: আইনি দৃষ্টিভঙ্গি’ বিষয়ে বক্তব্য দেন। তিনি ভোক্তাদের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করতে কার্যকর লেবেলিং নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহকারী বিজ্ঞানী ড. আহমদ খায়রুল আবরার ‘প্রমাণভিত্তিক তথ্য থেকে বাস্তবায়ন: অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং’ শীর্ষক উপস্থাপনায় বলেন, অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাদ্য সম্পর্কে স্পষ্ট সতর্কবার্তা ভোক্তাদের স্বাস্থ্যকর সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাবে।
বাংলাভিশনের সিনিয়র নিউজ এডিটর রুহুল আমিন রুশদ ‘ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং বিষয়ে গণমাধ্যমের সম্পৃক্ততা: প্রতিবেদন, কৌশল ও অ্যাডভোকেসি’ বিষয়ে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্য ইস্যুতে অনুসন্ধানী ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ভোরের আকাশ/সু.পা



