শিশুর মোবাইল, ট্যাব বা টেলিভিশনের স্ক্রিন ব্যবহারের নিরাপদ নিয়ম

ছবি: সংগৃহীত
দুই বছর বয়সের আগে কোনোভাবেই শিশুকে মোবাইল ফোন, ট্যাব বা টেলিভিশনের স্ক্রিন দেওয়া উচিত নয়। আর দুই থেকে তিন বছর বয়সে খুব সীমিত সময়ের জন্য স্ক্রিন ব্যবহার করতে দেওয়া যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বয়সে শিশুর মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হয়। প্রতি সেকেন্ডে অসংখ্য স্নায়ুবন্ধ (সিন্যাপস) তৈরি হয়, যা বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে আরও সমৃদ্ধ হয়।
শিশুর জন্য রং, শব্দ, গন্ধ, মানুষের মুখ, প্রকৃতি ও খেলাধুলার মতো বাস্তব অভিজ্ঞতাই সবচেয়ে কার্যকর শেখার মাধ্যম। তবে অতিরিক্ত ডিজিটাল স্ক্রিন সেই স্বাভাবিক শেখার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। যদিও ব্যস্ততার কারণে অনেক অভিভাবক শিশুর হাতে মোবাইল তুলে দিতে বাধ্য হন, তবু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার—দুটিই ক্ষতিকর। প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত ও সচেতন ব্যবহার।
প্রতিদিন কতক্ষণ স্ক্রিন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, দুই বছর বয়সের পরও দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন টাইম দেওয়া উচিত নয়। তবে এই সময়টুকু একটানা না দিয়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের ছোট ছোট সেশনে ভাগ করে দেওয়া ভালো। এতে শিশুর মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয় এবং চোখের ওপর চাপও কম পড়ে।
কনটেন্ট নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
শিশুকে মোবাইল বা টিভি ব্যবহারের সুযোগ দিলে কনটেন্ট নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব ভিডিও শিশুর জন্য উপযোগী নয়। বিশেষ করে সাধারণ ইউটিউব ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুপযুক্ত ভিডিও চলে আসার ঝুঁকি থাকে। তাই বয়স উপযোগী অ্যাপ, যেমন—ইউটিউব কিডস (YouTube Kids) এবং ফোনের প্যারেন্টাল কন্ট্রোল (Parental Control) ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত। পাশাপাশি আগে থেকেই বাছাই করা ভিডিও বা গাইডেড প্লেলিস্ট চালানো সবচেয়ে নিরাপদ।
কখন স্ক্রিন দেওয়া যাবে না?
খাওয়ার সময়, পড়াশোনার সময় এবং ঘুমানোর ঠিক আগে শিশুকে কোনোভাবেই স্ক্রিন দেওয়া উচিত নয়। খাওয়ার সময় স্ক্রিন দেখলে শিশুর মনোযোগ খাবার থেকে সরে যায়, চিবানোর অভ্যাস ব্যাহত হয় এবং পরে স্ক্রিন ছাড়া খেতে অনীহা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, ঘুমানোর আগে স্ক্রিন ব্যবহার করলে ঘুমের হরমোন মেলাটোনিনের নিঃসরণ কমে যায়। ফলে ঘুমের মান খারাপ হয় এবং পরদিন শিশুর আচরণ ও মনোযোগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
শিশুর পাশে থাকুন
শিশুকে ফোন বা টিভি দিয়ে একা ছেড়ে না দিয়ে পাশে বসে তার সঙ্গে কথা বলা উচিত। ভিডিওতে কী দেখছে, তা নিয়ে প্রশ্ন করুন, ব্যাখ্যা দিন এবং আলোচনা করুন। যেমন বলতে পারেন, ‘পাখিটা কী সুন্দর উড়ছে, দেখেছ?’ অথবা ‘ছেলেটা কীভাবে সমস্যার সমাধান করল, খেয়াল করো।’ এতে স্ক্রিন শুধু বিনোদনের মাধ্যম না হয়ে শেখার একটি অংশ হয়ে ওঠে। পাশাপাশি শিশুও বুঝতে শেখে, স্ক্রিন জীবনের একটি অংশ, পুরো জীবন নয়।
বাস্তব খেলাই হোক প্রধান বিনোদন
স্ক্রিনের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ কমাতে বাস্তব জীবনের বিকল্পগুলো আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। রংপেন্সিল, ব্লক, পাজল, গল্পের বই, আঁকাআঁকি এবং মুক্ত খেলাধুলা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে অনেক বেশি কার্যকর। শিশুর দিনের বেশিরভাগ সময় যদি খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে ব্যয় হয়, তাহলে সে স্বাভাবিকভাবেই স্ক্রিনের প্রতি কম আগ্রহী হবে।
শারীরিক নিরাপত্তাও জরুরি
স্ক্রিন ব্যবহারের সময় শিশুর শারীরিক নিরাপত্তার দিকেও নজর রাখতে হবে। টেলিভিশন অবশ্যই নিরাপদভাবে দেয়ালে স্থাপন করা উচিত। মোবাইল হাতে নিয়ে হাঁটাচলা বা দৌড়ানোর সুযোগ দেওয়া যাবে না। বসে, চোখ থেকে অন্তত এক হাত দূরে রেখে স্ক্রিন দেখাই নিরাপদ। এ ছাড়া স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা (ব্রাইটনেস) মাঝারি এবং শব্দের মাত্রা কম রাখা উচিত। অতিরিক্ত আলো ও উচ্চ শব্দ শিশুর চোখ ও মস্তিষ্কের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
ছোট একটি অভ্যাস, বড় উপকার
বিশেষজ্ঞরা একটি সহজ নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ দেন—‘স্ক্রিনের পর পাঁচ মিনিট বাস্তব খেলা।’ অর্থাৎ স্ক্রিন বন্ধ করার পর শিশুকে খেলনা, আঁকাআঁকি বা অন্য কোনো শারীরিক খেলায় যুক্ত করলে ধীরে ধীরে স্ক্রিনের ওপর নির্ভরতা কমে আসে।
বাবা-মাই শিশুর সবচেয়ে বড় আদর্শ
শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারের অভ্যাস অনেকটাই নির্ভর করে বাবা-মায়ের আচরণের ওপর। অভিভাবক যদি সবসময় ফোনে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে শিশুও সেটিই অনুসরণ করবে। তাই শিশুর সামনে নিজের স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কমিয়ে আনা এবং পরিবারে প্রযুক্তি ব্যবহারের স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ভোরের আকাশ/সু.পা



