পরামর্শ

শিশুর সুস্থ বিকাশে গর্ভাবস্থায় যেসব বিষয় জানা জরুরি

ছবি: সংগৃহীত

গর্ভকাল প্রতিটি নারীর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল একটি সময়। এ সময়ে গর্ভের সন্তান স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে কি না, তা নিয়ে মা ও পরিবারের উদ্বেগ থাকাই স্বাভাবিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভস্থ শিশুর ওজন ও শারীরিক বৃদ্ধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। কারণ, জন্মের সময় শিশুর ওজন তার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

প্রথম তিন মাসে ওজন নয়, গুরুত্ব পায় ভ্রূণের দৈর্ঘ্য
গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে ভ্রূণের ওজন নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা যায় না। এ সময় মূলত ভ্রূণের দৈর্ঘ্য পরিমাপের মাধ্যমে তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি মূল্যায়ন করা হয়। একই সঙ্গে এই পরিমাপের ভিত্তিতেই সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তাই প্রথম ত্রৈমাসিকে ওজনের চেয়ে ভ্রূণের গঠনগত বিকাশের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

চতুর্থ মাস থেকেই বাড়ে গুরুত্ব
গর্ভাবস্থার চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ মাস পর্যন্ত সময়টি শিশুর ওজন বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় থেকেই ভ্রূণের ওজন দ্রুত বাড়তে শুরু করে। তাই নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে শিশুর ওজন নির্ধারিত গ্রোথ চার্ট অনুযায়ী বাড়ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মায়ের ওজন নিয়মিত বৃদ্ধি পাওয়া গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের একটি ইতিবাচক লক্ষণ। তবে মায়ের ওজন স্থির থাকলে বা কমে গেলে বুঝতে হবে, শিশুটি প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ওজন কম হলে বাড়তে পারে ঝুঁকি
গর্ভস্থ শিশুর ওজন নির্ধারণে নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে। সাধারণভাবে ৩২ সপ্তাহে শিশুর ওজন প্রায় ১ হাজার ৯০০ গ্রাম থেকে ২ কেজির মধ্যে এবং ৩৬ সপ্তাহে প্রায় আড়াই কেজি হওয়া বাঞ্ছনীয়।

যদি নির্ধারিত সময়ের তুলনায় শিশুর ওজন কম থাকে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। এমনকি গুরুতর ক্ষেত্রে গর্ভস্থ শিশুর জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

পুষ্টিকর খাবারের বিকল্প নেই
গর্ভাবস্থায় শিশুর সঠিক ওজন নিশ্চিত করতে মায়ের সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় মাছ, মাংস বা ডিম রাখার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করা উচিত, যা শিশুর কোষ গঠন ও শারীরিক বিকাশে সহায়তা করে। পাশাপাশি ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে প্রতিদিন অন্তত এক গ্লাস দুধ পান করা প্রয়োজন।

এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের ডাল ও এক মুঠো বাদাম উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের ভালো উৎস। এগুলো শিশুর হাড় ও মস্তিষ্কের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি পূরণে নিয়মিত সবুজ শাকসবজি এবং মৌসুমি ফল খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মা যদি নিয়মিত সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করেন, তাহলে গর্ভস্থ শিশুর স্বাভাবিক ওজন নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বৃদ্ধি পায়।

জন্মের সময় কম ওজনের প্রভাব
জন্মের সময় একটি শিশুর আদর্শ ওজন ধরা হয় কমপক্ষে আড়াই কেজি। এর কম ওজনে জন্ম নেওয়া শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল থাকে। ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টিসহ বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজনও দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মায়ের অপুষ্টি সরাসরি শিশুর ওপর প্রভাব ফেলে। তাই গর্ভাবস্থায় মায়ের পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করাই সুস্থ ও স্বাভাবিক ওজনের শিশু জন্মের অন্যতম প্রধান শর্ত।

নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি
গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। আল্ট্রাসনোগ্রাফির মাধ্যমে শিশুর বৃদ্ধি ও ওজন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করলে যেকোনো সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অনুসরণ করলে সুস্থ, সবল ও স্বাভাবিক ওজনের শিশুর জন্ম নিশ্চিত করা অনেকটাই সহজ হয়।

ভোরের আকাশ/সু.পা

শিশুর সুস্থ বিকাশে গর্ভাবস্থায় যেসব বিষয় জানা জরুরি | স্বাস্থ্য কথা