স্বাস্থ্য প্রশাসন

স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যায় করবে সরকার: ড. তিতুমীর

ছবি: সংগৃহীত

দেশের স্বাস্থ্যখাতের বিদ্যমান সংকট দূর করতে ধাপে ধাপে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের (ইউএপি) ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের আয়োজনে ‘বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বাজেট সংলাপ: অগ্রাধিকার, ঘাটতি ও করণীয়’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

ড. তিতুমীর জানান, দেশে একটি সমন্বিত জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থার আওতায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্যখাতে বর্তমানে অবকাঠামো ও জনবলের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। কোথাও অবকাঠামো থাকলেও পর্যাপ্ত জনবল নেই, আবার কোথাও জনবল থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি খাতের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এখনও দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়েছেন।

অধ্যাপক তিতুমীর বলেন, বিভিন্ন গবেষণা ও সমীক্ষায় দেখা গেছে স্বাস্থ্যখাতের অনেক সমস্যার সমাধান পর্যাপ্ত বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্ভব। এ কারণে সরকার স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে শিশু থেকে প্রবীণ—সবার জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, “আমরা একটি কল্যাণরাষ্ট্র গঠনের পথে এগোচ্ছি। সে লক্ষ্যেই শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার জন্য পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার ধাপভিত্তিক কাঠামোতে রোগী প্রথমে সাধারণ চিকিৎসকের কাছে যাবেন, এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত সেবা পাবেন। ধাপে ধাপে উপজেলা পর্যায়ে করোনারি কেয়ার ইউনিট (সিসিইউ) ও কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।”

জনবল সংকট নিরসনে শিগগিরই পাঁচ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

অনুষ্ঠানে ইউএপি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান কে এম মুজিবুল হক বলেন, জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পখাত, সরকার এবং উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলা জরুরি। গবেষণা ও উদ্ভাবনভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

ইউএপির ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি হলো স্বাস্থ্যখাত। স্বাস্থ্য বাজেটকে আরও কার্যকর ও গবেষণাভিত্তিক করতে একাডেমিয়া, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক। তিনি দেশের স্বাস্থ্যখাতের অর্থায়ন কাঠামো, বর্তমান বাজেট বরাদ্দ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

প্যানেল আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিক্সের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, দেশের স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত ব্যয়ের বড় অংশ ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক সেবার পেছনে ব্যয় হচ্ছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দুর্বল হওয়ায় অনেক রোগী সরাসরি ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনছেন, যা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়াচ্ছে। তিনি সরকারি স্বাস্থ্য অবকাঠামো আরও কার্যকর করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের পরামর্শ দেন।

স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. লিয়াকত আলী বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এ খাতে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। তিনি চিকিৎসকের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ বাড়ানোর ওপরও জোর দেন।

হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ড. এম এইচ চৌধুরী লেলিন বলেন, দেশের মোট স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশই বেসরকারি খাত প্রদান করছে। তাই স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন পরিকল্পনায় বেসরকারি খাতকে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি তাদের তদারকির জন্য পৃথক একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা পরিদফতর গঠনের প্রয়োজন রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. সেলিম রেজা বলেন, এসডিজি-পরবর্তী সময়ে দেশের ওষুধ শিল্প নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে কাঁচামাল আমদানিনির্ভরতা কমাতে এখন থেকেই নীতিগত প্রস্তুতি গ্রহণ জরুরি।

আলোচনায় অংশগ্রহণকারী বক্তারা স্বাস্থ্যখাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং একাডেমিয়া, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান।

ভোরের আকাশ/সু.পা

স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যায় করবে সরকার: ড. তিতুমীর | স্বাস্থ্য কথা