তীব্র তাপপ্রবাহে হিটস্ট্রোক থেকে বাঁচতে করণীয়

ছবি: সংগৃহীত
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বয়ে যাওয়া তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিনের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকায় গরমের অস্বস্তি আরও প্রকট হচ্ছে। এ ধরনের বৈরী আবহাওয়ায় শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন।
চিকিৎসকদের মতে, তীব্র গরমে সামান্য অসতর্কতার কারণেও পানিশূন্যতা, হিট এক্সহসশন (গরমে ক্লান্তি) কিংবা প্রাণঘাতী হিটস্ট্রোক হতে পারে। তাই এই সময়ে সুস্থ থাকতে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। পর্যাপ্ত পানি পান করা, রোদ এড়িয়ে চলা এবং হিটস্ট্রোক সম্পর্কে সচেতন থাকাই হতে পারে বর্তমান পরিস্থিতিতে সুরক্ষিত থাকার প্রধান উপায়।
দিনে কতটুকু পানি পান করবেন?
তীব্র গরমে শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে প্রচুর পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। ফলে শরীরকে পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করতে পর্যাপ্ত পরিমণে পানি পান করা প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী—
পানির পরিমাণ: একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে অন্তত আড়াই থেকে তিন লিটার পানি পান করা উচিত। তবে যারা বাইরে কায়িক পরিশ্রম করেন বা বেশি ঘামেন, তাদের আরও বেশি পানি পান করা প্রয়োজন।
অন্যান্য তরল: পানির পাশাপাশি শরীরের ঘাটতি পূরণে ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ঘোল এবং তাজা ফলের রস বেশ সহায়ক।
নিয়ম: তৃষ্ণা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে, নির্দিষ্ট সময় পরপর নিয়মিত পানি পানের অভ্যাস করুন।
কখন বাইরে যাওয়া সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ?
চিকিৎসকদের মতে, সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সময়ে রোদের তীব্রতা ও তাপপ্রবাহ সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই এই সময়টুকুতে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়াই ভালো। যদি বাইরে বের হতেই হয়, তবে নিচের সতর্কতাগুলো মেনে চলুন:
বাইরে বের হওয়ার সময় অবশ্যই ছাতা, টুপি বা ক্যাপ ব্যবহার করুন।
শরীর ঠান্ডা রাখতে হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতি পোশাক পরিধান করুন।
দীর্ঘ সময় একটানা রোদে অবস্থান করা থেকে বিরত থাকুন।
যারা বাইরে কাজ করেন, তারা নির্দিষ্ট সময় পরপর ছায়াযুক্ত স্থানে গিয়ে বিশ্রাম নিন।
হিটস্ট্রোকের লক্ষণসমূহ
অতিরিক্ত তাপের কারণে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যাওয়াকে হিটস্ট্রোক বলে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পেলে এটি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। এর সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
শরীরের তাপমাত্রা হঠাৎ অতিরিক্ত (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি) বেড়ে যাওয়া
তীব্র মাথাব্যথা ও মাথা ঘোরানো
চণ্ড শারীরিক দুর্বলতা ও বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া
শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হওয়া এবং নাড়ির স্পন্দন বৃদ্ধি পাওয়া
মানসিক বিভ্রান্তি বা হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়া
ত্বক গরম, লালচে ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া (ঘাম না হওয়া)
হিটস্ট্রোক হলে প্রাথমিক করণীয়
আশেপাশের কেউ হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হলে দ্রুত নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে:
১. আক্রান্ত ব্যক্তিকে যত দ্রুত সম্ভব রোদের মধ্য থেকে সরিয়ে কোনো ছায়াযুক্ত বা শীতল স্থানে নিয়ে যান।
২. শরীরের আঁটসাঁট পোশাক ঢিলা করে দিন বা খুলে দিন।
৩. পুরো শরীরে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দিন অথবা ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর বারবার মুছে দিন। সম্ভব হলে আইস প্যাক বগল ও কুচকিতে ব্যবহার করুন।
৪. রোগীকে ফ্যান বা বাতাসের মাধ্যমে শীতল করার ব্যবস্থা করুন।
৫. আক্রান্ত ব্যক্তি জ্ঞান না হারালে তাকে ধীরে ধীরে পানি বা ওআরএস (ওরস্যালাইন) পান করান। অবচেতন বা বমি করতে থাকলে জোর করে কিছু খাওয়ানো যাবে না।
৬. অবস্থার উন্নতি না হলে বা রোগী অচেতন হয়ে পড়লে অবহেলা না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান।
তাপপ্রবাহের এই সময়ে শিশু, বয়স্ক, হৃদরোগী, ডায়াবেটিস আক্রান্ত এবং গর্ভবতী নারীদের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন। তাদের রোদ থেকে দূরে রাখা এবং পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার ও পানি নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সামান্য সচেতনতা ও সাধারণ কিছু নিয়ম মেনে চললেই তাপপ্রবাহজনিত অধিকাংশ স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানো সম্ভব।
সূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও), যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি)।
ভোরের আকাশ/সু.পা



