মক্কায় ড্রোন হামলার ‘ভিত্তিহীন’ অভিযোগ নিয়ে সৌদিকে সতর্ক করলো ইরান

সৌদি আরব কর্তৃক পবিত্র মক্কা নগরী লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কাউকে নির্দিষ্টভাবে অভিযুক্ত করার আগে সতর্ক হতে এবং বিষয়টির রাজনৈতিকীকরণ না করতে আহ্বান জানিয়েছে ইরান।
গত মঙ্গলবার সৌদি আরব দাবি করে যে, তারা মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই দক্ষিণ দিকে একটি হুতি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ 'মিথ্যা ও বানোয়াট' বলে প্রত্যাখ্যান করার পর ইরান এই প্রতিক্রিয়া জানায়।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জোর দিয়ে বলেন যে, পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষা দেওয়া একটি সার্বজনীন অগ্রাধিকার। তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো উপসংহারে পৌঁছানোর বিষয়ে সতর্ক করে দেন তিনি।
সৌদি আরবের নাম না নিয়ে তিনি লেখেন, ইসলামি পবিত্র স্থান, বিশেষ করে মক্কা আল-মুকাররমা, মদিনা আল-মুনাওয়াররা এবং আল-আকসা মসজিদের পাশাপাশি এগুলোর তীর্থযাত্রী ও প্রতিবেশীদের ওপর যেকোনো ধরনের আগ্রাসন বা হুমকি একটি নিন্দনীয় অপরাধ।
বিবৃতিতে বাঘাই বলেন, মক্কা অভিমুখে যাওয়া একটি ড্রোন মাঝপথে ধ্বংসের ‘কেবলই এক দাবির’ ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট কোনো পক্ষ বা হুথিদের অভিযুক্ত করা যায় না। বিশেষ করে, যেখানে হুথি প্রশাসন এই দাবি সরাসরি ও স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধন কিংবা বিদ্যমান ভূ-রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও গভীর করতে পবিত্র স্থানগুলোকে ঘিরে আসা এমন অভিযোগ ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে আঞ্চলিক পক্ষগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ইরানি মুখপাত্র লেখেন, ইসলামি পবিত্র স্থান ও সেগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করা প্রয়োজন। আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি কিংবা কোন্দল সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে এটিকে ব্যবহার করা একদমই উচিত নয়।
এর পাশাপাশি যাচাই না করা এসব সামরিক প্রতিবেদন অঞ্চলের বাস্তব চিত্রকে বিভ্রান্ত করতে পারে উল্লেখ করে বাগাই অতীতে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘটিত বৃহত্তর সংঘাত থেকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ সরাতে অতীতে অনেক ভুয়া অভিযানের ঘটনা দেখা গেছে।
এই কৌশলগুলো প্রধানত অঞ্চলে ইহুদিবাদী শাসক ও যুক্তরাষ্ট্রের অপরাধ ঢাকতে এবং ইসলামি দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ তৈরি করতেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তাই সবাইকে চরম সতর্কতা ও সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে, কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের সরকারি সামরিক বাহিনী দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তাইজ এবং মোখায় হুথিদের রসদ সরবরাহ কেন্দ্র ও সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করেছে।
পাশাপাশি ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি ইয়েমেনে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত ক্যাথরিন কর্ম-কামুন-এর সাথে এক বৈঠকে জানিয়েছেন, তাইজ, মারিব, লাহজ, আল-জাওফ, হাজ্জাহ, আল-বায়দা এবং আল-ধালের মতো প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে হুথি বিদ্রোহীরা এখন প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছে।
একই সময়ে ইউকে মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে যে, ইয়েমেনের বন্দর নগরী এডেন থেকে প্রায় ৭৫ নটিক্যাল মাইল পূর্বে একটি তেলবাহী ট্যাংকারকে একটি দ্রুতগতির ছোট নৌকা অনুসরণ করেছে এবং সেটি পথরোধ করার চেষ্টা চালিয়েছে।
এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে সংস্থাটি জানায়, পশ্চিমগামী একটি ট্যাংকার রিপোর্ট করেছে যে একটি স্পিডবোট তাদের অনুসরণ করে পথ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করে। কর্তৃপক্ষ বর্তমানে ঘটনাটি তদন্ত করছে এবং উক্ত অঞ্চলের অন্যান্য জাহাজগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচল করতে পরামর্শ দিয়েছে।
এর আগে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন সৌদি আরবের পক্ষ থেকে আসা পবিত্র মক্কা নগরী লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার অভিযোগটি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে। এই দাবিকে ‘বানোয়াট ও মিথ্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তারা নিশ্চিত করে যে, তাদের সমস্ত সামরিক অভিযান কেবল সৌদি আরবের সামরিক ও তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করেই চালানো হয়, যা ইসলামি পবিত্র স্থানগুলো থেকে বহু দূরে অবস্থিত।
মেসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি সৌদি রাজতন্ত্রের নাম উল্লেখ করে জানান, এই প্রতারণামূলক অপপ্রচার কাউকে বিভ্রান্ত করতে পারবে না।
ইয়াহিয়া সারি বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য হলো সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও সামরিক ঘাঁটিগুলো, যা পবিত্র স্থানগুলো থেকে অনেক দূরে অবস্থিত এবং ইয়েমেন থেকে পবিত্র স্থানগুলোর ওপর কোনো ধরণের হুমকি নেই।
এর আগে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট দাবি করেছিল, মক্কা নগরীর নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই নগরীর দক্ষিণে একটি ড্রোন ধ্বংস করেছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সৌদি জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালকি ঘটনাটিকে একটি শত্রুতাপূর্ণ সন্ত্রাসী কাজ বলে অভিহিত করেন এবং মক্কা-মদিনা ও সেখানে আসা পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তাকে একটি লাল রেখা বা স্পর্শকাতর বিষয় বলে উল্লেখ করেছিলেন।
ভোরের আকাশ/আ.র