বিশ্বের প্রথম ঘোড়ার টানা বাস চালু হয়েছিল ১৬৬২ সালে

বর্তমান বিশ্বের ব্যস্ত নগরীগুলোতে গণপরিবহন বা পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ছাড়া জীবন অচল। তবে সাধারণ মানুষের জন্য নির্ধারিত রুটে ভাড়ার বিনিময়ে যাতায়াতের এই আধুনিক ধারণার সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে। বিখ্যাত ফরাসি বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও দার্শনিক ব্লেজ প্যাস্কেল ১৬৬২ সালে ফ্রান্সে বিশ্বের প্রথম নির্ধারিত রুটের ঘোড়ার টানা গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করেন।
‘কারোসেস আ সিঙ্ক সোলস’ নামের এই উদ্যোগটিই ইতিহাসে বিশ্বের প্রথম বাস সার্ভিস বা গণপরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত।
১. ব্লেজ প্যাস্কেল ও গণপরিবহনের আইডিয়া
পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতে অসামান্য অবদানের জন্য ব্লেজ প্যাস্কেল বিখ্যাত হলেও জীবনের শেষভাগে তিনি সামাজিক ও দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দেন। তখনকার দিনে প্যারিস শহরে যাতায়াতের জন্য কেবল ধনী ব্যক্তিদের নিজস্ব ঘোড়ার গাড়ি ছিল, সাধারণ মানুষের হেঁটে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।
১৬৬১ সালে প্যাস্কেল ও তাঁর ধনী বন্ধু দ্য রুয়ানেস মিলে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠান। তাঁদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন এক পরিবহন ব্যবস্থা চালু করা, যা নির্দিষ্ট রুট ও সময়সূচী মেনে চলবে এবং ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে নির্দিষ্ট ভাড়ায় সবাইকে সেবা দেবে।
২. ঐতিহাসিক উদ্বোধন ও ‘ফাইভ সোলস’ সেবা
রাজা চতুর্দশ লুইয়ের অনুমতি পাওয়ার পর ১৬৬২ সালের ১৮ মার্চ প্যারিসের রাস্তায় আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে বিশ্বের প্রথম ঘোড়ার টানা বাস ব্যবস্থা।
নামকরণ ও ভাড়া: প্রতিটি যাত্রার জন্য ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল ‘পাঁচ সোলস’, যা ছিল তৎকালীন ফরাসি মুদ্রা। ফলে পুরো ব্যবস্থাটি ‘কারোসেস আ সিঙ্ক সোলস’ নামে পরিচিতি পায়।
সক্ষমতা ও রুট: বিশেষ কাঠের তৈরি এই বগিগুলোতে একসাথে ৮ জন যাত্রী বসতে পারতেন। এটি টানা হতো চার থেকে ছয়টি ঘোড়া দিয়ে। প্যারিস শহরের মধ্যে নির্দিষ্ট ৫টি রুটে এটি চলাচল করত।
নিয়মানুবর্তিতা: যাত্রী থাকুক বা না থাকুক, গাড়িগুলো নির্দিষ্ট সময় পরপর ছকে বাঁধা রুট ধরে যাতায়াত করত—যা ছিল পরিবহন ব্যবস্থায় এক সম্পূর্ণ নতুন যুগান্তকারী বিপ্লব।
৩. শ্রেণি বৈষম্য ও প্রকল্পটির পতন
সূচনার প্রথম দিকে এই পাবলিক বাস সার্ভিসটি সাধারণ ও অভিজাত শ্রেণির মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তবে তৎকালীন ফরাসি সামাজিক কাঠামোর কারণে দ্রুতই এতে বিপত্তি দেখা দেয়।
তৎকালীন পার্লামেন্ট একটি বিতর্কিত নিয়ম জারি করে যে—কৃষক, দিনমজুর, সৈন্য বা নিচু শ্রেণীর পোশাক পরিহিত নাগরিকরা এই উচ্চমানের বাসে উঠতে পারবে না। কেবল অভিজাত ও উচ্চবিত্ত সমাজ এটি ব্যবহার করতে পারবে। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি করা এই সার্ভিস তার মূল লক্ষ্য হারিয়ে ফেলে।
এর পাশাপাশি ভাড়ার দাম বৃদ্ধি পাওয়া এবং ১৬৬২ সালের আগস্টেই উদ্যোক্তা ব্লেজ প্যাস্কেলের মাত্র ৩৯ বছর বয়সে অকাল মৃত্যুর কারণে প্রকল্পটি গতি হারায়। অবশেষে চালুর মাত্র কয়েক বছরের মাথায় ১৬৭৭ সালে এই পরিষেবাটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
প্যাস্কেলের এই উদ্ভাবনটি সাময়িক বন্ধ হলেও গণপরিবহনের যে বীজ তিনি ১৬৬২ সালে বুনেছিলেন, তা নষ্ট হয়নি। প্রায় দেড়শো বছর পর ১৯ শতকের শুরুতে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে পুনরায় আধুনিক ঘোড়ার টানা ও পরবর্তীতে বাষ্পীয় বাস চালু হয়। আজ বিশ্বজুড়ে যে উন্নত পাবলিক বাস নেটওয়ার্ক আমরা দেখি, তার মূল কারিগর ছিলেন ওই সপ্তদশ শতাব্দীর গণিতবিদ ব্লেজ প্যাস্কেলই।
ভোরের আকাশ/জেআ