বিশ্বকাপের উন্মাদনায় উৎসবমুখর চট্টগ্রাম

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপকে ঘিরে চট্টগ্রামজুড়ে শুরু হয়েছে উৎসবের আমেজ।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই নগরীর অলিগলি, পাড়া-মহল্লা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই এখন একটাই আলোচনার বিষয়, বিশ্বকাপ ফুটবল।
এবারের বিশ্বকাপ শুরু হবে ১১ জুন। প্রায় এক মাসব্যাপী এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে ১৯ জুলাই। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল অংশ নিচ্ছে এই আসরে, যেখানে মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ফলে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
নগরীর জিইসি মোড়, চকবাজার, আগ্রাবাদ, মুরাদপুর, কাজীর দেউড়ি, বহদ্দারহাট ও নিউমার্কেট এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে বিশ্বকাপ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। কে শিরোপা জিতবে, কোন দল সবচেয়ে শক্তিশালী, কোন তারকা খেলোয়াড় টুর্নামেন্ট মাতাবেন এসব বিষয় নিয়ে প্রতিদিন জমে উঠছে আড্ডা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেন আসিফ বলেন, “বিশ্বকাপ আমাদের কাছে শুধু খেলা নয়, এটি একটি উৎসব। বন্ধুদের নিয়ে উদ্বোধনী ম্যাচ দেখার পরিকল্পনা করেছি। খেলার সময় সবাই একসঙ্গে বসে আনন্দ ভাগাভাগি করব।”
আরেক শিক্ষার্থী তকি তাজোয়ার আদিল বলেন, “বিশ্বকাপ এলেই চারপাশের পরিবেশ বদলে যায়। কয়েক সপ্তাহের জন্য পুরো পৃথিবী যেন ফুটবলের দুনিয়ায় চলে যায়।”
পতাকা ও জার্সির জমজমাট বাজার বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে পতাকা ও জার্সির বাজারে। রেয়াজউদ্দিন বাজার, সিনেমা প্যালেস, নিউমার্কেট, কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়াম মার্কেট ও চন্দনপুরা এলাকায় ফুটবলপণ্যের বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ।
ব্যবসায়ীরা জানান, ছোট আকারের পতাকা ১৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হলেও বড় পতাকার দাম ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। বিভিন্ন দেশের সমর্থকেরা তাদের পছন্দের দলের পতাকা কিনতে ভিড় করছেন।
রিয়াজউদ্দিন বাজারের ব্যবসায়ী মো. আজাদ বলেন, “বিশ্বকাপের এক মাস আগে থেকেই পতাকার চাহিদা বাড়তে শুরু করেছে। এবারও আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে।”
কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়াম মার্কেটের এক বিক্রেতা জানান, তরুণদের মধ্যে জার্সির প্রতি আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। ২৫০ টাকা থেকে শুরু করে উন্নত মানের জার্সি ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, পর্তুগাল, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি এবং ইংল্যান্ডের জার্সির চাহিদা উল্লেখযোগ্য।
পতাকা তৈরিতে ব্যস্ত কারখানা ও দোকান নগরীর সিনেমা প্যালেস এলাকার ছোট ছোট কারখানাগুলোতে দিনরাত চলছে পতাকা তৈরির কাজ। সেলাই মেশিনের শব্দ আর কর্মীদের ব্যস্ততা জানান দিচ্ছে বিশ্বকাপের আগমনের খবর।
পতাকা প্রস্তুতকারক মো. আলি জানান, “বিশ্বকাপ সামনে রেখে কয়েক মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছি। কাপড় সংগ্রহ, ডিজাইন তৈরি এবং সেলাইয়ের কাজ শেষ করে ইতোমধ্যে হাজার হাজার পতাকা বাজারে পাঠানো হয়েছে।”
তিনি বলেন, “আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা সবচেয়ে বেশি তৈরি করতে হয়। তবে ফ্রান্স, পর্তুগাল, জার্মানি ও স্পেনের পতাকার চাহিদাও বাড়ছে।”
বড় পর্দায় খেলা দেখার প্রস্তুতি শুধু ঘরে বসে টেলিভিশনে খেলা দেখার পরিকল্পনা নয়, নগরীর বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে ও কমিউনিটি সেন্টারে বড় পর্দায় ম্যাচ দেখানোর আয়োজনও করা হচ্ছে।
অনেক ক্যাফে কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বিশেষ অফার ঘোষণা করেছে। খেলা চলাকালে দর্শকদের জন্য খাবার ও পানীয় প্যাকেজ রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে প্রস্তুতি। বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপ ও কমিউনিটি পেজে ‘ওয়াচ পার্টি’ আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। অনেক তরুণ বন্ধুদের নিয়ে ছাদে প্রজেক্টর বসিয়ে ম্যাচ উপভোগের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
চকবাজারের বাসিন্দা টিটু বলেন, “গত কয়েকটি বিশ্বকাপে আমরা বন্ধুরা একসঙ্গে প্রজেক্টরে খেলা দেখেছি। এবারও একই পরিকল্পনা রয়েছে। খেলার আনন্দ সবাই মিলে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে আলাদা মজা আছে।”
পাড়া-মহল্লায় সমর্থকদের প্রতিযোগিতা বিশ্বকাপকে ঘিরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সমর্থকদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে উৎসবমুখর প্রতিযোগিতা। অনেক স্থানে রাস্তার দুই পাশে প্রিয় দলের পতাকা টাঙানো হয়েছে। কোথাও কোথাও বিশাল ব্যানার, ফেস্টুন ও তোরণ নির্মাণ করা হচ্ছে।
বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থকদের মধ্যে পতাকা টানানো নিয়ে আলাদা উন্মাদনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে নিজেদের দলের পক্ষে প্রচারণা ও শুভকামনা।
গ্রামাঞ্চলেও বিশ্বকাপের আমেজ শুধু নগরীতে নয়, চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলেও বিশ্বকাপের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। হাটবাজার, চায়ের দোকান ও গ্রামীণ আড্ডাগুলোতে এখন ফুটবলই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
অনেক এলাকায় বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হচ্ছে। স্থানীয় যুবসমাজ প্রজেক্টর ও সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা করছে যাতে সবাই একসঙ্গে খেলা উপভোগ করতে পারে।
শিশু-কিশোরদের মধ্যেও উচ্ছ্বাস বিশ্বকাপের প্রভাব পড়েছে শিশু-কিশোরদের মাঝেও। অনেকে প্রিয় দলের জার্সি পরে ঘুরছে, কেউ আঁকছে প্রিয় খেলোয়াড়ের ছবি, আবার কেউ স্কুলের খাতায় এঁকে ফেলছে পছন্দের দেশের পতাকা।
অভিভাবকরাও সন্তানদের সঙ্গে বিশ্বকাপের গল্প করছেন। অনেক পরিবার রাত জেগে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ একসঙ্গে দেখার পরিকল্পনা করেছে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব বিশ্বকাপকে ঘিরে শুধু ক্রীড়াঙ্গন নয়, ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পতাকা, জার্সি, স্পোর্টস সামগ্রী, ইলেকট্রনিক্স, প্রজেক্টর ভাড়া, রেস্টুরেন্ট ও ক্যাফে ব্যবসায়ীরা বাড়তি ক্রেতা পাচ্ছেন। ফলে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্যও বিশ্বকাপ একটি অর্থনৈতিক সুযোগ হয়ে উঠেছে।
উৎসবের রঙে রাঙা বন্দরনগরী ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হতে যতই সময় ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে উত্তেজনা। পাড়া-মহল্লার আড্ডা, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সবখানেই এখন ফুটবলের জয়জয়কার। শিশু, তরুণ, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে প্রবীণরাও এই উৎসবে শামিল হয়েছেন।
সব মিলিয়ে বিশ্বকাপকে ঘিরে চট্টগ্রাম যেন পরিণত হয়েছে এক বিশাল ফুটবল উৎসবের নগরীতে, যেখানে আগামী এক মাস কেবল ফুটবলই থাকবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ভোরের আকাশ/ র.ই