আদ্-দ্বীনের সংস্কার শেষে পরিদর্শনে সন্তুষ্ট প্রতিনিধি দল, লাইসেন্স ফেরার ইঙ্গিত

ছবি: সংগৃহীত
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় গত ১১ জুন রাজধানীর আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করে সরকার। একই সঙ্গে ৩০ দিনের মধ্যে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ দেওয়া হয়। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে লাইসেন্স পুনর্বহালের আবেদন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতালটি পরিদর্শন করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি প্রতিনিধি দল। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার উপপরিচালক ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি হাসপাতাল পরিদর্শন করে।
পরিদর্শন শেষে ডা. সৈয়দ আবু আহাম্মদ শাফী বলেন, "আজ আমরা হাসপাতালটি পরিদর্শন করেছি। তারা ব্যাপক সংস্কার করেছে। যত দ্রুত সম্ভব পরিদর্শন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর হাসপাতালের লাইসেন্স বিষয়ে মন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেবেন।"
তিনি জানান, তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন, আলো-বাতাস চলাচলসহ বিভিন্ন অসংগতি দূর করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবকাঠামোগত পরিবর্তন এনেছে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট সংস্কার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "আলাদা কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব অসংগতি উঠে এসেছিল, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেগুলো সংস্কার করেছে।"
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতালটির লাইসেন্স পুনর্বহালের বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক অবস্থান রয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও চলছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়টি স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই তদারকি করছেন। হাসপাতালটি বন্ধ থাকায় নিয়মিত চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীরা, বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ, ভোগান্তিতে পড়েছেন। পাশাপাশি মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে হাসপাতালটিতে ইন্টার্নশিপরত শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এছাড়া দেশের খ্যাতনামা অনেক চিকিৎসকও লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন।
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার হাসপাতালটির লাইসেন্স পুনর্বহালের উদ্যোগ নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রতিনিধি দলের পরিদর্শনও সেই প্রক্রিয়ার অংশ। আগামী রোববার বা সোমবারের মধ্যে পরিদর্শন প্রতিবেদন জমা পড়লে ওই সপ্তাহেই লাইসেন্স ফেরানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
গত সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও হাসপাতালটি নিয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেন। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর থেকেই হাসপাতালটির অবকাঠামো পুনর্গঠনের কাজ চলছে। আইসিইউ ইউনিটের দরজা-জানালাসহ বিভিন্ন অবকাঠামোগত পরিবর্তন করা হয়েছে এবং ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রস্তাব দিয়েছে। পরিদর্শন শেষে সবকিছু সন্তোষজনক হলে সরকার পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক জামালুন্নেছা কথা বলতে রাজি হননি। তবে হাসপাতালটির নার্সিং বিভাগের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাহিদ ইয়াসমিন বলেন, "সরকারের প্রতিনিধি দল আজ সংস্কার কার্যক্রম পরিদর্শন করেছে। আমরা হাসপাতালের বিভিন্ন অবকাঠামো সংস্কার করেছি। আশা করি, সবকিছু পর্যালোচনা করে সরকার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা আবারও রোগীদের সেবা দিতে প্রস্তুত।"
যে কারণে বাতিল হয়েছিল লাইসেন্স
গত ২৭ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ড-২-এ এক থেকে চার দিন বয়সী ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ওয়ার্ডে অক্সিজেনের স্বল্পতা, দীর্ঘ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) ব্যবস্থা বন্ধ থাকা, বিকল্প ভেন্টিলেশনের অভাব, বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধি এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলাকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
গত ৪ জুন তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেওয়া হয়। প্রথমে ৭২ ঘণ্টা সময় দেওয়া হলেও পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আবেদনের পর আরও ৪৮ ঘণ্টা সময় বাড়ানো হয়। ৯ জুন তারা লিখিত জবাব জমা দেয়।
জবাব পর্যালোচনা শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যায় প্রয়োজনীয় তথ্যের চেয়ে অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ই বেশি ছিল এবং সেটি সন্তোষজনক নয়। ফলে 'দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২'-এর ১১(২)(খ) ধারা অনুযায়ী হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করা হয়।



