ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ দরকার : ডা. মুশতাক

ছবি: সংগৃহীত
দেশে আগামী দিনে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন।
তিনি বলেছেন, ডেঙ্গুকে ‘পাবলিক হেলথ এমারজেন্সি’ বা জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু হাসপাতালের আইসিইউ বাড়ানো বা কীটনাশক ছিটানোর মতো প্রচলিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। শনিবার (৪ জুলাই) রাজধানীতে ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত ‘হটস্পট’ দ্রুত শনাক্ত করে সেখানে র্যাপিড রেসপন্স টিম মোতায়েন করতে হবে। কোনো এলাকায় রোগী শনাক্ত হলে আক্রান্ত ব্যক্তির বাড়ির আশপাশে অন্তত এক কিলোমিটার এলাকায় আরও রোগী রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে ওই এলাকায় এডিস মশার লার্ভা ও পূর্ণবয়স্ক মশার উপস্থিতিও শনাক্ত করতে হবে।
তিনি জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য এনএস-ওয়ান (NS1) পরীক্ষার সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। সাধারণ মানুষকে ‘অসচেতন’ বলার প্রবণতার সমালোচনা করে ডা. মুশতাক বলেন, মানুষ জানে মশার কামড়ে ডেঙ্গু হয়। কিন্তু কোথায় এবং কীভাবে এডিস মশার বংশবিস্তার হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি তথ্য তাদের কাছে পৌঁছায়নি। তাই শুধু সচেতনতা নয়, মানুষকে সঠিক তথ্য দিয়ে ‘ইনফর্মড’ বা অবহিত করাও জরুরি।
তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষ অর্থাভাবে কিংবা যাতায়াত ব্যয়ের কারণে সময়মতো হাসপাতালে যেতে পারেন না। আবার অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ব্লাড ব্যাংক বা প্লাটিলেট সেপারেটরের মতো প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকায় রোগীদের ঢাকায় পাঠানো হয়। ফলে অনেকেই গুরুতর অবস্থার আগে হাসপাতালে যেতে অনীহা দেখান।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, স্থানীয় সরকার, সমাজকল্যাণ ও ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ‘পাবলিক হেলথ এমারজেন্সি’ ঘোষণা করার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে (বা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বে) একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল অ্যান্ড কমান্ড সেন্টার গঠন করে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) সম্পৃক্ত করার প্রস্তাব দেন।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, নাগরিকদের জরিমানা করার পরিবর্তে সেবামূলক উদ্যোগ বেশি কার্যকর হতে পারে। সিটি করপোরেশন বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে বাসাবাড়ি লার্ভামুক্ত করার কারিগরি সেবা চালু করা যেতে পারে। এতে দমনমূলক ব্যবস্থার পরিবর্তে মানুষকে ইতিবাচকভাবে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকর হস্তক্ষেপ ছাড়া ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভারত ও শ্রীলঙ্কাতেও রয়েছে, তবে রোগী অনুপাতে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর মৃত্যুহার বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে তৃণমূলভিত্তিক কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনায় অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসমীম, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজিস্ট ও মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. মো. তারিকুল ইসলাম লিমন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভিন এবং বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ বক্তব্য দেন।
ভোরের আকাশ/সু.পা



