স্বাস্থ্য শিক্ষা

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হতে পারে সারাদিন ক্লান্তি

ছবি: সংগৃহীত

কাজের চাপ বা কম ঘুমই নয়, সারাদিন ধরে অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভবের পেছনে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়াও (হাই ব্লাড সুগার) একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, রক্তে অতিরিক্ত শর্করা শরীরের কোষে শক্তি উৎপাদনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। ফলে পর্যাপ্ত গ্লুকোজ থাকা সত্ত্বেও শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি পায় না এবং দীর্ঘ সময় ধরে ক্লান্তি ও অবসন্নতা অনুভূত হয়।

স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথলাইন-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে শরীরের শক্তি কমে যায় এবং ক্লান্তি ভর করে।

সাধারণভাবে উচ্চ রক্তশর্করা বা হাইপারগ্লাইসেমিয়াকে ডায়াবেটিসের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। তবে মার্কিন চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ ডা. কেলি উডের মতে, ডায়াবেটিস না থাকলেও বিভিন্ন কারণে একজন সুস্থ মানুষের রক্তে সাময়িকভাবে শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার—যেমন সাদা ভাত, ময়দাজাত খাবার ও ফাস্টফুড—খাওয়ার পর রক্তে হঠাৎ শর্করার মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে অ্যাকিউট হাইপারগ্লাইসেমিয়া বলা হয়। এ ছাড়া অতিরিক্ত মানসিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের স্ট্রেস, সংক্রমণ কিংবা অন্য কোনো অসুস্থতার কারণে শরীরে কর্টিসলসহ বিভিন্ন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা রক্তে শর্করার পরিমাণও বৃদ্ধি করতে পারে।

কেন বাড়তি শর্করায় ক্লান্তি আসে?

গ্লুকোজ শরীরের প্রতিটি কোষের প্রধান জ্বালানি। কিন্তু রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে সেই গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করে শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে না। ফলে শরীরে জ্বালানি থাকলেও তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।

ডা. কেলি উড বলেন, অতিরিক্ত শর্করার কারণে শরীরে প্রদাহ (ইনফ্লেমেশন) তৈরি হয়, পানিশূন্যতা দেখা দেয় এবং হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এসব কারণে শরীর আরও দুর্বল, অবসন্ন ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

প্রি-ডায়াবেটিসের নীরব সংকেত হতে পারে ক্লান্তি

অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাঁরা প্রি-ডায়াবেটিস পর্যায়ে রয়েছেন। এ অবস্থায় রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলেও তা ডায়াবেটিসের পর্যায়ে পৌঁছায় না। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান মেয়ো ক্লিনিক বলছে, প্রি-ডায়াবেটিসের লক্ষণ অনেক সময় এতটাই সূক্ষ্ম হয় যে সহজে বোঝা যায় না।

তবে দীর্ঘদিন ক্লান্তির পাশাপাশি নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত—

  • ঘন ঘন তৃষ্ণা লাগা ও মুখ শুকিয়ে যাওয়া।
  • বিশেষ করে রাতে বারবার প্রস্রাব হওয়া।
  • হঠাৎ দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়া।
  • শরীরের ক্ষত স্বাভাবিকের তুলনায় ধীরে শুকানো।

শর্করা নিয়ন্ত্রণে করণীয় : বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তে শর্করার ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে রাখতে কিছু সহজ অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

  1. প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট, অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয় ও মিষ্টি কমিয়ে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে হবে।
  2. খাদ্যতালিকায় আঁশসমৃদ্ধ শাকসবজি, ডাল ও ফলমূল রাখতে হবে এবং পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।
  3. প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা প্রয়োজন।
  4. মানসিক চাপ কমানোর পাশাপাশি প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করতে হবে।
  5. পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও দীর্ঘদিন ক্লান্তি না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শে ফাস্টিং ব্লাড সুগার পরীক্ষা করানো উচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তিকে অবহেলা করা ঠিক নয়। এটি অনেক সময় শরীরের ভেতরে চলমান কোনো সমস্যার প্রাথমিক সতর্কসংকেত হতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা শরীর সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই প্রতিবেদনটি কেবল সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সমস্যা, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য অবশ্যই একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ভোরের আকাশ/সু.পা

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হতে পারে সারাদিন ক্লান্তি | স্বাস্থ্য কথা