পরামর্শ

স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি, লক্ষণ ও প্রতিরোধ যা জানা জরুরি

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে দিন দিন বাড়ছে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা। নারীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের মধ্যে স্তন ক্যান্সারই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে ৪০ বছরের বেশি বয়সী নারীরা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হলেও অল্পসংখ্যক পুরুষও এর শিকার হন। সময়মতো শনাক্ত ও চিকিৎসা না হলে এই ক্যান্সার দ্রুত শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে এবং জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলে। তাই বিশেষজ্ঞরা লক্ষণ দেখা দেওয়ার আগেই নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

স্তন ক্যান্সার কী
শরীরের কোনো অংশে কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ঘটলে তাকে ক্যান্সার বলা হয়। স্তনের কোষ অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেলে সেটিকে স্তন ক্যান্সার বলা হয়। শুরুতে এটি স্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও চিকিৎসা না হলে দ্রুত শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসার কারণে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

যেসব কারণে বাড়ে ঝুঁকি
স্তন ক্যান্সারের নির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে গবেষণায় কয়েকটি ঝুঁকির কারণ চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—৪০ বছরের বেশি বয়স, স্থূলতা, হরমোনজনিত সমস্যা, বংশগত ইতিহাস, দেরিতে সন্তান গ্রহণ, সন্তানকে বুকের দুধ না খাওয়ানো, মাসিক ও প্রজননসংক্রান্ত কিছু জৈবিক কারণ এবং জীবনযাপনের নানা অভ্যাস। পুরুষদেরও স্তন ক্যান্সার হতে পারে, যদিও এ হার এক শতাংশেরও কম।

কী কী লক্ষণে সতর্ক হবেন
প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যান্সারের তেমন কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তাই নিয়মিত স্ক্রিনিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। যেমন—
স্তনে শক্ত ও স্থির ধরনের চাকা বা গিঁট অনুভূত হওয়া।
স্তনের বোঁটা ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া।
নিপল দিয়ে রক্ত বা পুঁজ বের হওয়া।
নিপলে চুলকানি বা লালচে ভাব দেখা দেওয়া।
স্তনের ত্বক মোটা হয়ে কমলালেবুর খোসার মতো হয়ে যাওয়া।
বগলে চাকা বা গিঁট অনুভূত হওয়া।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাড়ে ব্যথা, দীর্ঘদিন কাশি বা জন্ডিসের মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

কারা বেশি ঝুঁকিতে
সব নারীই স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। যেমন—যারা দেরিতে সন্তান নেন, সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান না, পরিবারের কারও স্তন ক্যান্সারের ইতিহাস রয়েছে, অতিরিক্ত রেডিয়েশনের সংস্পর্শে এসেছেন কিংবা আগে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বর্তমানে ৪০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের মধ্যে এ রোগের প্রকোপ বেশি হলেও তরুণীদের মধ্যেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।

চিকিৎসকের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে, লক্ষণ প্রকাশের অপেক্ষা না করে নির্দিষ্ট সময় পরপর স্ক্রিনিং করা উচিত। ৩৫ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে আল্ট্রাসনোগ্রাফি এবং ৩৫ বছরের বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ম্যামোগ্রাফি করা যেতে পারে। পরিবারের কারও স্তন ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে ২৫ বছর বয়স থেকেই নিয়মিত স্ক্রিনিং শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া ২০ বছর বয়সের পর থেকেই নারীদের নিজের স্তন নিজে পরীক্ষা করার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।

লজ্জা নয়, চিকিৎসাই হোক অগ্রাধিকার
অনেক নারী সামাজিক সংকোচ বা লজ্জার কারণে দীর্ঘদিন রোগের লক্ষণ গোপন রাখেন। ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নারী সার্জন ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। তাই লজ্জা বা সংকোচ না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে গেলে প্রাথমিক পর্যায়েই রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা সম্ভব।

চিকিৎসা
স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসা রোগীর অবস্থা ও ক্যান্সারের পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়। অপারেশনের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোন থেরাপি কিংবা লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে রোগীর জন্য সর্বোত্তম চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়। সরকারি হাসপাতালেও তুলনামূলক কম খরচে এসব চিকিৎসার সুযোগ রয়েছে, পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও চিকিৎসা দেওয়া হয়।

প্রতিরোধে সচেতনতা
স্তন ক্যান্সার শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। এজন্য স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা, নিয়মিত ব্যায়াম ও কায়িক পরিশ্রম করা, অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, ফাস্টফুড কম খাওয়া, সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ানো এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং করানো জরুরি। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তের উদ্যোগই স্তন ক্যান্সারে মৃত্যুহার কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায়।

ভোরের আকাশ/সু.পা