সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারী ২০২৬ ০২:৫০ এএম
ছবি- ভোরের আকাশ
গ্রামবাংলার শাশ্বত রূপের অংশ শীতকালীন ঐতিহ্য খেজুর রস বর্তমানে অনেকটা দুস্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে। স্থানীয় ভাবে মানুষের মাঝে খেজুর রসের অনেক কদর থাকলেও এই রসের সন্ধানে গলদঘর্ম হয় ক্রেতারা। তবে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় এখনও খেজুর রসের চিরচেনা স্বাদে মাতোয়ারা হয় চারপাশ। শীতের সকালে সোনারগাঁয়ে এক দশক আগেও চোখে পড়ত খেজুর গাছ কাটা সরঞ্জাম ও রসের হাঁড়ি হাতে গাছিদের ব্যস্ততার দৃশ্য।
শীতের মৌসুম শুরু হলেই বাড়ি বাড়ি চলত খেজুরের রস ও রসের পাটালি গুড় দিয়ে বাহারি পিঠাপুলির আয়োজন। কিন্তু কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলার এই চিরচেনা দৃশ্য এখন আর তেমন চোখে পড়েনা। সোনারগাঁয়ে ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস ও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এর প্রধান কারন হচ্ছে আগের তুলনায় খেজুর গাছের সংখ্যা হ্রাস, কলকারখানা, ইটভাটা স্থাপন ও কৃষিজমি রূপান্তর করে ঘরবাড়ী নির্মাণ, তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহ, দক্ষ গাছির সংকট ও আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে শীতের পিঠা-পায়েসের অন্যতম প্রধান উপাদান এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যের এই ধারাটি আজ বিপন্ন প্রায়। ফরিদপুর জেলা থেকে আগত সোনারগাঁয়ে অবস্থানরত গাছি শহিদ মোল্লা জানান, তিনি প্রায় ১৫ বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে জড়িত। গত কয়েক বছর আগেও সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন এলাকায় কয়েক শত খেজুর ছিল। আগে এমন কোনো পাড়া-মহল্লা ছিলনা যেখানে ৫/১০টি খেজুর গাছ ছিল না। এখন মানুষের ঘনবসতি, জায়গা জমি ভরাট করা ও নানা ধরনের ফল গাছ লাগানোর কারণে খেজুর গাছ আগের মতো দেখা যায় না। প্রাকৃতিক ভাবে অনেকের বাড়ীতে নতুন গাছ জন্মালেও আগাছা মনে করে মানুষ নির্দিধায় কেটে ফেলেন খেজুরগাছ। বর্তমানে তিনি সোনারগাঁ উপজেলার হামছাদি এলাকায় একাধিক মালিকের মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ টি খেজুর গাছ কাটেন। প্রতিদিন ভোরবেলা ও সন্ধ্যারাতে দুই বেলা গাছ থেকে রস নামানো হয়। ৩০/৩৫টি গাছ থেকে মাত্র চার/পাঁচ কলসি খেজুরের রস সংগ্রহ করতে পারেন তিনি। রস বিক্রি করে মালিক পক্ষের একটি অংশ বাদ দিয়ে তার দৈনিক আয় হয় আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা। তিনি আরো বলেন, স্থানীয় মানুষের মাঝে খেজুর রসের অনেক চাহিদা রয়েছে, চাহিদার বিপরিতে রসের যোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছেনা। যার ফলে শীত মৌসুমে অনেকের রস খাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও তা পূর্ণ হচ্ছেনা।
সরেজমিন, ভোরবেলা সোনারগাঁ উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের হামছাদী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গাছি শহিদ মোল্লা রস সংগ্রহ করার সময় খেজুর গাছ তলায়, বিশুদ্ধ রস খাওয়ার জন্য ভোর থেকেই ভিড় করছেন সাধারন মানুষ। তবে গাছ কম থাকায় গ্রাহক চাহিদার তুলনায় রসের যোগান অনেক কম। প্রতি লিটার খেজুর রস বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়। তার পরেও চারদিকে ঘন কুয়াশার চাদরে ডাকা, হাড় কাপানো শীতে বিশুদ্ধ খেজুর রস পাণ করে উচ্ছাসিত মানুষ। বিশুদ্ধ রস পাণ করার জন্য লক্ষে মোটরসাইকেল করে আসা উদ্ধবগঞ্জ এলাকার যুবক আলমগীর হোসেন বলেন, এক সময় উপজেলার সর্বত্র পাড়া মহল্লায় ভোর সকালে খেজুর রস নিয়ে পসরা বসাতেন গাছীরা। বর্তমান সময়ে খেজুর গাছ না থাকায় টাটকা ও বিশুদ্ধ রস সংগ্রহ করা দুর্লভ হয়ে পড়েছে। মানুষের কাছ থেকে খবর শুনে ভোরবেলা হামছাদী এলাকায় এসেছি খেজুর রস খেতে। বিশুদ্ধ খেজুর রস খেয়ে অনেক তৃপ্তি পেয়েছি। শীত মৌসুমের রসনা খেজুর রস বাড়ীতে নিয়ে যাওয়ার জন্য আরো দুই লিটার নিয়েছি।
হামছাদী এলাকার বাসিন্দা খেজুর গাছ মালিক রাকিব হোসেন ও রোমান মিয়া জানান, ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার গাছী শহিদ মোল্লার সঙ্গে শীত মৌসুমের চুক্তিতে আমরা তাকে ২৭ টি খেজুর দিয়েছি। ডিসেম্বর থেকে খেজুর রস নামানো শুরু করেছে সে। এখন পর্যন্ত প্রায় দুই লাখ টাকার রস বিক্রি করেছে। মৌসুম শেষে আরো এক লাখ টাকার মতো বিক্রি হবে আমরা আশাবাদী। আমাদের এলাকার খেজুর রস খাওয়ার জন্য বহু দূর দুরান্ত থেকে অনেক মানুষ আসে। কিন্তু গাছ কম হওয়ায় সবার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এবিষয়ে সোনারগাঁ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সাইদ তারেক বলেন, সোনারগাঁ থেকে খেজুর গাছ এখন বিপন্ন প্রায়। যদি কোন বাগান মালিক খেজুরগাছ পরিচর্চায় আমাদের পরামর্শ চায় তাহলে অবশ্যই পরামর্শ দিব।
ভোরের আকাশ/র.ই