দুশ্চিন্তায় জোট প্রার্থীরা
আর মাত্র ৩০ দিন পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জয়ের টাগের্টে ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছে দুটি জোট। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট আর জামায়াতে ইসলাম নেতৃত্বাধীন জোট। ভোটের দিনক্ষণ যতই এগিয়ে আসছে, ততই মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জোটের প্রার্থীদের- এমনটাই ভাবছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।বিশিষ্টজনরা মনে করছেন, ভোটের দিন যতই এগিয়ে আসছে, ততই মাথা ব্যাথার কারণ হচ্ছে জোটসঙ্গী ছোট দলগুলোর প্রার্থীদের। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটসঙ্গী প্রার্থীদের আসনে বিএনপির বিদ্রোহী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন অনেকেই। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া নেতাদেরকে দল থেকে ইতোমধ্যে বহিষ্কার করেছে বিএনপি, তবুও ভোটের মাঠে লড়ছেন বহিস্কৃতরা। সর্বপরি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে জোটের প্রার্থীরা। তবে জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করে আনতে বিভিন্ন কৌশল ও পদক্ষেপসহ বিদ্রোহীদের বুঝিয়ে প্রার্থীতা প্রত্যাহারে রাজী করানো যায় কি না সেবিষয়টিও মাথায় রেখে এগোচ্ছে বিএনপির হাইকমান্ড। তারপরও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থাকছে জোটসঙ্গী দলগুলোর প্রার্থীর-বলছেন রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।অন্যদিকে নির্বাচনী মাঠে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বধীন ১১ দলীয় জোটে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে আসন সমঝোতা নিয়ে রয়েছে জটিল সংকট। তবে সংকট কাটিয়ে উঠার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে দলগুলোর সূত্রে জানা গেছে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জামায়াতে ইসলামী ২৭৬টি আসনে এবং ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি আসনে দলীয় প্রার্থী দেয়। পাশাপাশি এনসিপি ৪৭টি, এবি পার্টি ৫৩টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি, খেলাফত মজলিস ৬৮টি, এলডিপি ২৪টি, খেলাফত আন্দোলন ১১টি, নেজামে ইসলাম পার্টি ৬টি, জাগপা ৩টি এবং বিডিপি ২টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়। তবে এনসিপির একটি আসনের মনোনয়ন পত্র যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হয়। কাজেই এনসিপির মনোনয়ন বৈধ হয় ৪৬টি। জোট হলেও ভোটের মাঠে এখনো আসনভিত্তিক সমঝোতার সংকট বিরাজমান। আবার সমঝোতা যাই হোক কোন কোন দল বলছে, সমঝোতার ধরন যা-ই হোক, নির্ধারিত কিছু আসনে দলীয় প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। কাজেই জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলের আসন বণ্টন নিয়ে সংকট কাটেনি। ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের মধ্যে আসনসংখ্যা নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। সার্বিক বিষয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে জোট প্রার্থীরা-সূত্রে জানা যায়।সূত্রে মতে, ১১ দলের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আকাঙ্খিত সংখ্যায় আসন না পাওয়ায় এই জোটের পুরাতন সঙ্গী ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দলের অসন্তোষ যেমন রয়েছে, তেমনি জোটের প্রার্থীদের আসন দিতে গিয়ে বিভিন্ন আসনে জামায়াতে ইসলামীর নিজ দলের নেতাকর্মীদেরও মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি স্বীকারও করেছেন জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দলের নেতারা। আসন সমঝোতার বাইরে, এই জোটের নেতৃত্ব নিয়ে এনসিপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ দুই দলের মধ্যে অনেকটা নীরব যুদ্ধও চলছে।দলীয় সূত্রগুলো বলছে, সমঝোতা সিদ্ধান্তে বিলম্ব এবং আপাতত যেসব আসনে সমঝোতার সিদ্ধান্ত হয়েছে সেগুলো নিয়ে মাঠ পর্যায়ের অসন্তোষ বেশ প্রকট।আসন নিয়ে দলগুলোর নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকায় এমন সমঝোতা সংকট দেখা দিয়েছে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।তাদের মতে, ছাড় দিয়ে হলেও আলোচনার মাধ্যমে কোনো একটা সমাধান আসা এখনই উপযুক্ত সময়। অন্যথায় সমঝোতার প্রক্রিয়াটিই একটি সংকটে পরিণত হবে। যা ভোটের মাঠে জয় পেতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে দলগুলোর প্রার্থীদের-এটাই ভাবছেন রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। বরিশাল-৫ (সদর) আসন নিয়ে টানাটানি জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের বরিশাল সদরের চরমোনাই ইউনিয়ন। ইসলামী আন্দোলনের মূল কেন্দ্র এখানে। চরমোনাই ইউনিয়নটি পড়েছে বরিশাল সদরের মধ্যে। এই আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে প্রার্থী হয়েছেন দলটির সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। আবার এই একই আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলাল। একই জোটে থাকা দুই দলের কেউই আসনটি ছাড়তে চান না। ফলে দুই প্রার্থী নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে দু’দলের মধ্যে। বিশেষ করে যেখানে চরমোনাই পীরের মূল কেন্দ্র, সেখানে জামায়াতের প্রার্থী দেওয়াকে ভালোভাবে নেয়নি ইসলামী আন্দোলন।এ নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির ও বরিশাল-৫ আসনে দলটির প্রার্থী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, আমরা তো জামায়াত আমির ডা. শফিক সাহেবের আসনে প্রার্থী দেই নাই। সেখানে আমাদের এখানে তাদের প্রার্থী দেওয়াটা অসুন্দর হয়েছে। এই এলাকায় আমাদের ভিত্তি। এখানে জোটের কেউ নির্বাচন করবে, এটা সম্ভব? এটা কি হওয়া উচিত?’ তবে ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হলেও জামায়াত এই আসনটি ছাড়তে রাজি নয়। এর পেছনে দলটির যুক্তি হচ্ছে, ইসলামী আন্দোলনের সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বরিশাল-৫ আসনের সঙ্গে বরিশাল-৬ আসনেও প্রার্থী হয়েছেন। তাকে দুটি আসনে মনোনয়ন না নিয়ে বরিশাল-৬ এ নিতে বলছে জামায়াত।বরিশালে ইসলামী আন্দোলন এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যখন টানাপোড়েন, তখন স্বস্তি নেই রাজনীতিতে জামায়াতের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটেও। উদাহারণ হিসেবে বলা যায়- বরিশালেরই পাশের জেলা পুটয়াখালী-৩ আসনের কথা। এই আসনটি গলাচিপা এবং দশমিনা নিয়ে গঠিত। এ আসনে বিএনপির কোনো আনুষ্ঠানিক প্রার্থী নেই। এখানে দলটির নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে শরীক দল গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূরকে। কিন্তু জোটের মনোনয়ন পেলেও এলাকায় বিএনপির সমর্থন পাচ্ছেন না তিনি। এ বিষয়ে নুরের দাবি, এলাকায় বিএনপির যে নেতাকর্মী আছে, তাদের ৯০ শতাংশই বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। তবে পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হাসান মামুন। যদিও সম্প্রতি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। হাসান মামুন দলের মনোনয়ন না পাওয়ায় স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।সম্প্রতি গলাচিপা এলাকায় তার একটি ঘরোয়া বৈঠকে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদেরই দেখা যায়। উপজেলা বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদলের পদধারী অনেক নেতাই ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এসব কমিটির অধিকাংশই হাসান মামুনের তত্ত্বাবধায়নে গঠিত হওয়ায় নেতাকর্মীরা সরাসরি তার পক্ষেই কাজ করছেন। এ প্রসঙ্গে হাসান মামুনের দাবি, বিএনপিকে বাঁচাতেই তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন।তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্ধারণে যখন ভুল হয়, তখন জনগণের মধ্য থেকে নেতৃত্ব বেরিয়ে আসে। এই আসনটি যখন জোটকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে, তখন তৃণমূল নেতৃত্বের মধ্যে সেন্টিমেন্ট জাগ্রত হয়েছে যে, এখানে বিএনপির প্রার্থী থাকা উচিত। এখানে বিএনপির সমস্ত নেতাকর্মী আমার সঙ্গে আছেন। কারণ তারা জানে, এই সিট যদি আমরা গণঅধিকারকে ছেড়ে দেই, তাহলে আগামী ৩০ বছরেও এটি আর বিএনপি পাবে না। হাসান মামুন বিএনপির না হয়েও যেন বিএনপিরই প্রার্থী। কারণ স্থানীয় নেতাকর্মীরা মূলত : তার পক্ষেই কাজ করছেন। ফলে জোটের প্রার্থী হলেও আসনটিতে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর মধ্যে। একইসঙ্গে শরিকদের অন্য আসনগুলোতেও বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় সেটা পুরো জোটের মধ্যেই এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি করেছে।কাজেই বিএনপি এখন পর্যন্ত শরিকদের জন্য আসন ছেড়েছে ১২টি। আরও যেসব আসন নিয়ে আলোচনা চলছে এর সবগুলোতেই বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় সেটা জোটের শরীকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। যদিও বিদ্রোহী প্রার্থীদের অনেককেই বিএনপি বহিষ্কার করেছে। তবে এতেই সন্তুষ্ট নয় শরীক দলগুলো। কারণ রাজনীতিতে অতীত অভিজ্ঞতা হচ্ছে, দল থেকে বহিষ্কার হলেও পরে আবার তাদের দলে ফেরত নেওয়া হয়। বিশেষ করে নির্বাচনে জিতে গেলে দলে ফিরতে সময় লাগে না। এই কারণেই জোট শরীকদের সন্দেহ এই বিদ্রোহী প্রার্থীদের সরানো না হলে ভোটের মাঠে জেতা কঠিন হয়ে পড়বে। একইসঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের পাশে পাওয়া যাবে না।এ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থী যেন না থাকে, সে বিষয়ে চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, যারা দাঁড়িয়ে গেছে, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখন এটাকে সন্দেহ করলে সেটা করাই যায়। শরীক দলগুলো কিন্তু ভালো করেই জানে তারেক রহমান পর্যন্ত বিদ্রোহীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। এখন শুনছে না। সময় তো এখনো শেষ হয়নি। মনোনয়ন প্রত্যাহার পর্যন্ত সময় আছে।বিএনপি তাদের ভাষায় সমাধানের চেষ্টা করছে। কিন্তু জামায়াতসহ ১১ দলের যে জোট, সেখানে এখনো পর্যন্ত আসন সমঝোতাই শেষ হয়নি। ফলে জামায়াতের এই জোটের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অস্থিরতা। যার মূল কেন্দ্রে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন। দল দুটি প্রায় পৌনে তিনশ আসনে প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে জোটের ভবিষ্যত নিয়ে। ইসলামী আন্দোলন অন্তত একশ আসন বা এর কিছু কমবেশি হতে পারে- এমন সংখ্যক আসন ছাড়া জোটের আসন বণ্টনে যাওয়াকে ‘সম্মানজনক’ মনে করছে না ইসলামী আন্দোলন।এ প্রসঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম বলেন, একশ আসন কিংবা এর উপরে বা এর আশেপাশে- এরকম হলে আমি মনে করি বণ্টনটা আমাদের জন্য সম্মানসূচক হয়। এটা স্পষ্ট যে, জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের আসন বণ্টন নিয়ে জটিলতা না কাটলে সেটা জোট ভাঙার দিকেও গড়াতে পারে। এর বিপরীতে থাকা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ভাঙনে আশঙ্কা নেই, তবে শরিকদের মধ্যে বিএনপির তৃণমূলের সমর্থন নিয়ে সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। সবমিলিয়ে জোট দুটির মধ্য দুশ্চিন্তায় রয়েছে ছোট দলের প্রার্থীরা।ভোরের আকাশ/এসএইচ