চোখেই মিলতে পারে ফ্যাটি লিভারের সতর্ক সংকেত

ছবি: সংগৃহীত
অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, স্থূলতা এবং ডায়াবেটিসের মতো নানা কারণে বর্তমানে দ্রুত বাড়ছে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা। একসময় এটি মূলত প্রবীণদের রোগ হিসেবে বিবেচিত হলেও এখন কম বয়সীদের মধ্যেও উদ্বেগজনক হারে দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো— প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি সাধারণত কোনো স্পষ্ট উপসর্গ তৈরি করে না। ফলে অনেকেই বুঝতে পারেন না যে তাদের লিভারে ইতোমধ্যে চর্বি জমতে শুরু করেছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, লিভারের কার্যকারিতা ব্যাহত হলে তার কিছু প্রভাব চোখেও দেখা যেতে পারে। কারণ, শরীরের বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ, রক্ত পরিশোধন এবং ক্ষতিকর উপাদান অপসারণে লিভার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই চোখের কিছু পরিবর্তন ফ্যাটি লিভারের সম্ভাব্য সতর্কবার্তা হতে পারে।
চোখে যে পরিবর্তনগুলো দেখা যেতে পারে
চোখের সাদা অংশ হলদেটে হয়ে যাওয়া : চোখের সাদা অংশে হলুদাভ আভা দেখা গেলে তা জন্ডিসের লক্ষণ হতে পারে। লিভারের কার্যকারিতা কমে গেলে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যায়, যার ফলে এমন পরিবর্তন দেখা দেয়। এটি গুরুতর লিভার সমস্যার ইঙ্গিতও হতে পারে।

চোখে শুষ্কতা ও জ্বালাভাব : চোখ বারবার শুকিয়ে যাওয়া, জ্বালা করা বা অস্বস্তি অনুভব করা অনেক সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। লিভারের কার্যক্ষমতা কমে গেলে প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়া বেড়ে গিয়ে চোখের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে যেতে পারে।
চোখের নিচে স্থায়ী কালো দাগ : পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রামের পরও যদি চোখের নিচের কালো দাগ দূর না হয়, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে এমন লক্ষণ দেখা দিতে পারে, যা কখনও কখনও লিভারের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত।
চোখের চারপাশে ফোলাভাব : চোখের পাতা বা আশপাশে অস্বাভাবিক ফোলাভাব দেখা দিলে তা শরীরে তরল জমার লক্ষণ হতে পারে। বিপাকীয় ভারসাম্যহীনতা এবং লিভারের কার্যকারিতা হ্রাসের কারণে এমন সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ঝাপসা দৃষ্টি : সব রোগীর ক্ষেত্রে না হলেও, কিছু ক্ষেত্রে ফ্যাটি লিভারের সঙ্গে ঝাপসা দেখার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা মেটাবলিক সিনড্রোমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
কেন দেরিতে ধরা পড়ে?
ফ্যাটি লিভারের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ থাকে না। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা অন্য কোনো কারণে আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করতে গিয়ে রোগটি ধরা পড়ে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
স্থূলতায় ভোগা ব্যক্তি
ডায়াবেটিস রোগী
উচ্চ কোলেস্টেরলে আক্রান্ত ব্যক্তি
যারা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন না
অতিরিক্ত মিষ্টি, কোমল পানীয় ও জাঙ্ক ফুড গ্রহণকারীরা
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
চোখের রঙে পরিবর্তন, দীর্ঘদিন ক্লান্তি অনুভব করা, চোখের চারপাশে ফোলাভাব কিংবা ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে লিভার ফাংশন টেস্ট এবং আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করানো যেতে পারে।
প্রতিরোধের উপায়
ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সুষম খাদ্যাভ্যাস: খাদ্যতালিকায় সবুজ শাকসবজি, তাজা ফল, ওটস এবং পর্যাপ্ত পানি রাখুন। চিনি, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার কমিয়ে দিন।
ওজন নিয়ন্ত্রণ: স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার চেষ্টা করুন।
নিয়মিত ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা হাঁটা বা শরীরচর্চা করুন।
পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম নিশ্চিত করুন।
ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার: লিভার সুস্থ রাখতে এসব অভ্যাস থেকে দূরে থাকুন।
তবে মনে রাখতে হবে, চোখের এসব পরিবর্তন দেখা গেলেই যে ফ্যাটি লিভার হয়েছে, এমন নয়। এগুলো শরীরের অন্য সমস্যারও ইঙ্গিত হতে পারে। তাই কোনো লক্ষণকে অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।
ভোরের আকাশ/সু.পা



