ইঁদুর মানেই আতঙ্ক নয় : কোনগুলোতে থাকে হান্টাভাইরাসের ঝুঁকি

ছবি: সংগৃহীত
বাড়ির স্টোররুমের পুরোনো বাক্সের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ইঁদুর বা বাগানের দেয়াল বেয়ে দ্রুত ছুটে যাওয়া ছোট প্রাণীটিকে অনেকেই সাধারণ বিষয় হিসেবে ধরে নেন। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, সব ইঁদুর নিরীহ নয়—কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতি এমন ভাইরাস বহন করতে পারে যা মানুষের জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো হান্টাভাইরাস, যা একটি প্রাণঘাতী সংক্রমণ হিসেবে পরিচিত এবং মূলত কিছু নির্দিষ্ট বন্য ইঁদুরের মাধ্যমে ছড়ায়।
পুরোনো গুদামঘর, বন্ধ স্টোররুম, গ্যারেজ, টিনশেড বা দীর্ঘদিন অযত্নে থাকা ঘর খোলার সময় এই ঝুঁকি আরও বেশি সামনে আসে। অনেকের ধারণা, সব ধরনের ইঁদুরই সমানভাবে বিপজ্জনক। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন এবং ঝুঁকি নির্ভর করে নির্দিষ্ট ইঁদুরের প্রজাতি ও অবস্থানের ওপর।
ভারতের অ্যাস্টার হোয়াইটফিল্ড হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের প্রধান পরামর্শক ডা. সুচিস্মিতা রাজামান্যা বলেন, সব ইঁদুর হান্টাভাইরাস বহন করে না। কোন ধরনের ইঁদুর কোথায় পাওয়া যাচ্ছে, তার ওপরই সংক্রমণের ঝুঁকি নির্ভর করে।
সব ইঁদুর নয়, কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতিই ঝুঁকিপূর্ণ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব ইঁদুর হান্টাভাইরাস ছড়ায় না। ঝুঁকি নির্ভর করে নির্দিষ্ট প্রজাতি ও অঞ্চলের ওপর। ভারতের অ্যাস্টার হোয়াইটফিল্ড হাসপাতালের ডা. সুচিস্মিতা রাজামান্যা জানান, কিছু বন্য ইঁদুর—যেমন ডিয়ার মাউস ও কিছু ফিল্ড মাউস—এই ভাইরাসের প্রধান বাহক। তবে শহুরে সাধারণ ইঁদুর সাধারণত এই ভাইরাস ছড়ায় না। যুক্তরাষ্ট্রের CDC-র তথ্য অনুযায়ী, ডিয়ার মাউস হান্টাভাইরাস সংক্রমণের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পর্কিত।
পরিষ্কার করার সময়ই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি
হান্টাভাইরাস সংক্রমণের বেশিরভাগ ঘটনা ঘটে পুরোনো স্টোররুম, গুদাম বা ইঁদুরের বাসা পরিষ্কার করার সময়। ইঁদুরের মল, প্রস্রাব বা লালা শুকিয়ে বাতাসে মিশে গেলে সেখান থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। ডা. রাজামান্যার মতে, ঝাড়ু বা শুকনো পরিষ্কার করার সময় এসব কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, যা শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। তাই শুকনো ঝাড়ু বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ব্যবহার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। CDC-ও পরামর্শ দেয়, বন্ধ ঘর পরিষ্কারের আগে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে এবং জীবাণুনাশক ব্যবহার করতে।
বিরল হলেও কেন এত গুরুত্ব দেওয়া হয়
হান্টাভাইরাস সংক্রমণ খুব সাধারণ নয়, তবে একবার গুরুতর হলে দ্রুত অবনতি ঘটে। শুরুতে এটি ফ্লুর মতো মনে হতে পারে—জ্বর, শরীরব্যথা, দুর্বলতা বা বমি বমি ভাব। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই এটি হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোমে রূপ নিতে পারে, যেখানে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং মৃত্যুহার প্রায় ৩৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে চিকিৎসকদের ধারণা।
কোথায় ঝুঁকি বেশি থাকে
ইঁদুর সাধারণত অন্ধকার, নির্জন ও খাবারসমৃদ্ধ জায়গায় বাসা বাঁধে। যেমন—স্টোররুম, শেড, কম্পোস্ট এলাকা, পুরোনো বাক্স বা পোষা প্রাণীর খাবারের আশপাশ। বর্ষাকাল, শীতকাল বা বন্যার সময় ইঁদুর ঘরের কাছাকাছি চলে আসায় ঝুঁকি আরও বাড়ে।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হওয়া দরকার
ঘরের কোণায় ছোট মল
কাগজ বা কাপড় কুঁচিয়ে বানানো বাসা
দেয়াল বা কাঠে কাটা দাগ
বন্ধ ঘরে দুর্গন্ধ
খাবারের আশপাশে চলাচলের চিহ্ন
তবে এসব দেখলেই আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।
নিরাপদভাবে পরিষ্কার করার নিয়ম
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইঁদুর-আক্রান্ত জায়গা পরিষ্কার করার সময় সতর্কতা খুব জরুরি—
প্রথমে জানালা খুলে ৩০ মিনিট বাতাস চলাচল করান
গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করুন
ময়লার ওপর জীবাণুনাশক বা ব্লিচ স্প্রে করুন
শুকনো ঝাড়ুর বদলে টিস্যু বা পেপার টাওয়েল ব্যবহার করুন
বর্জ্য সিল করা ব্যাগে ফেলুন
কাজ শেষে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন
যুক্তরাষ্ট্রের EPA-র পরামর্শ অনুযায়ী, ঘরের ফাঁকফোকর বন্ধ করলে ইঁদুর প্রবেশের ঝুঁকি কমে যায়।
সতর্কবার্তা : ইঁদুর সাধারণত শুধু বিরক্তিকর প্রাণী হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু কখনো কখনো তারা গুরুতর রোগের বাহক হতে পারে। হান্টাভাইরাস মনে করিয়ে দেয়—পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং সঠিকভাবে পরিষ্কার করার অভ্যাস জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ভয় নয়, সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
ভোরের আকাশ/সু.পা



