খিদে পেলেই কেন মেজাজ খিটখিটে লাগে? জানুন কারণ

ছবি: সংগৃহীত
অনেকেই মজা করে বলেন, "খেতে দাও, না হলে কথা বলব না।" তবে বিষয়টি শুধু হাস্যরসের নয়। ক্ষুধা মানুষের মেজাজে বাস্তব প্রভাব ফেলে। এ কারণেই ইংরেজিতে 'হ্যাংরি' (Hungry + Angry) শব্দটির প্রচলন হয়েছে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুধার্ত অবস্থায় শরীরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে, যা ক্লান্তি, বিভ্রান্তি, বিরক্তি ও রাগের মতো আবেগকে তীব্র করে তোলে। এর অন্যতম কারণ হলো রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে যাওয়া।
কেন গুরুত্বপূর্ণ গ্লুকোজ?
গ্লুকোজ শরীরের প্রতিটি কোষের প্রধান শক্তির উৎস। বিশেষ করে মস্তিষ্ক প্রায় পুরোপুরি এই গ্লুকোজের ওপর নির্ভরশীল। রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কমে গেলে মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত শক্তি পায় না। ফলে দুর্বল লাগা, মাথা ঘোরা, মনোযোগে ঘাটতি এবং খিটখিটে মেজাজের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা অত্যন্ত কম থাকলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে কোমার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
ক্ষুধা লাগলে কেন বাড়ে বিরক্তি?
শুধু গ্লুকোজের ঘাটতিই নয়, ক্ষুধার সময় শরীরে একাধিক হরমোনও সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর মধ্যে অন্যতম ঘ্রেলিন, যা পাকস্থলী থেকে নিঃসৃত হয়ে মস্তিষ্ককে খাবারের প্রয়োজনীয়তার সংকেত দেয়।
একই সময়ে শরীরে কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোনের মাত্রাও বাড়তে থাকে। এই হরমোন লিভারে সঞ্চিত চর্বি ও প্রোটিন ভেঙে গ্লুকোজ তৈরি করতে সাহায্য করে, যাতে শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি পায়। তবে কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে গেলে মস্তিষ্কে ডোপামিন ও সেরোটোনিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসে। ফলে ইতিবাচক অনুভূতি কমে গিয়ে মানুষ তুলনামূলক বেশি রাগান্বিত ও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
অ্যাড্রেনালিনও রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
ক্ষুধার সময় অ্যাড্রেনালিন হরমোনও সক্রিয় হয়। এটি শরীরের 'ফাইট অর ফ্লাইট' বা 'লড়াই কিংবা পালিয়ে যাওয়ার' প্রতিক্রিয়াকে উদ্দীপিত করে। কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন একসঙ্গে কাজ করার ফলে ক্ষুধার্ত অবস্থায় আবেগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ছোটখাটো বিষয়েও সহজেই বিরক্তি বা রাগ প্রকাশ পেতে পারে।
শুধু মানুষের ক্ষেত্রেই নয়
গবেষণায় দেখা গেছে, এই আচরণ শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জেব্রাফিশের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্ষুধার্ত অবস্থায় মাছগুলো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি আক্রমণাত্মক আচরণ করে।
বিবর্তনের সঙ্গেও রয়েছে সম্পর্ক
বিজ্ঞানীদের মতে, এই আচরণের পেছনে বিবর্তনেরও ভূমিকা রয়েছে। প্রাচীনকালে খাদ্যের সংকট মোকাবিলা এবং খাবারের জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রয়োজন থেকেই মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে আক্রমণাত্মক মনোভাব গড়ে ওঠে। বর্তমানে সেই পরিস্থিতি না থাকলেও শরীরের প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়াটি এখনও রয়ে গেছে।
কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন?
ক্ষুধাজনিত বিরক্তি কমাতে কয়েকটি অভ্যাস কার্যকর হতে পারে—
- সেহরি বা সকালের খাবারে ওটস, লাল চাল ও ডালের মতো জটিল কার্বোহাইড্রেট রাখুন, যা ধীরে ধীরে গ্লুকোজ সরবরাহ করে।
- খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ফাইবার যোগ করুন। এগুলো দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন। ঘুমের ঘাটতি বিরক্তি আরও বাড়াতে পারে।
- হালকা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা মাইন্ডফুলনেস চর্চা আবেগ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষুধা লাগলে মেজাজ খারাপ হওয়া মানবদেহের স্বাভাবিক জৈবিক প্রতিক্রিয়া। এটি দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং শরীরের শক্তির প্রয়োজনীয়তার একটি সংকেত। সচেতন খাদ্যাভ্যাস ও সঠিক জীবনযাপন অনুসরণ করলে এই 'হ্যাংরি' অনুভূতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
ভোরের আকাশ/সু.পা



